মেসির খাদ্যাভ্যাস: ৩৭ বছরেও শীর্ষে থাকার রহস্য কী
লিওনেল মেসি। নামটাই যেন ফুটবল ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। দুই দশকের বেশি সময় ধরে ফুটবলের রাজত্বে তিনি যেন এক অপরাজেয় সম্রাট। বার্সেলোনার মেরুন-নীলে শুরুর দিনগুলো থেকে মায়ামির গোলাপি রঙে, কিংবা আর্জেন্টিনার জার্সিতে বিশ্বজয়ের চূড়ান্ত প্রাপ্তি, সাফল্য আর ট্রফির ভিড় কখনো থামেনি তাঁর ক্যারিয়ারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ৩৭ বছর বয়সেও এমবাপ্পে-হলান্ড-ইয়ামালদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে যাওয়ার রহস্যটা কী? ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভা? নিঃসন্দেহে। তবে কেবল শৈল্পিক পায়ে ভর করে দুই যুগ ধরে পাহাড়ের চূড়ায় টিকে থাকা যায় না। পরিশ্রমের ঘাম, আধুনিকতম ফিটনেস প্রযুক্তি, চোট এড়িয়ে চলার জটিল জ্যামিতি আর মাঠের পেছনের কঠোর আত্মত্যাগ ছাড়া এই দীর্ঘস্থায়িত্ব অসম্ভব। কিন্তু এই দৃশ্যমান লড়াইয়ের আড়ালে রয়েছে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, মেসির খাদ্যাভ্যাস। সাঁইত্রিশে পৌঁছেও সর্বোচ্চ স্তরের তীব্রতা ধরে রাখার রহস্য লুকিয়ে আছে তাঁর খাবারের থালায়।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে মেসির খাদ্যাভ্যাস কেমন ছিল?
ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে মেসির খাদ্যাভ্যাস মোটেও একজন পেশাদার ক্রীড়াবিদের মতো ছিল না। পিৎজা, ফাস্ট ফুড আর কোমল পানীয় ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। সঙ্গে পছন্দের তালিকায় থাকত আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী খাবার 'মিলানেসা', যা মূলত বিস্কুটের গুঁড়ায় মুড়িয়ে তেলে ভাজা গরুর মাংসের ফিলে। প্রথম প্রথম অবশ্য এসব গায়েই মাখেননি মেসি। ডিফেন্স দুমড়েমুচড়ে একে একে ব্যালন ডি'অর জিতছিলেন, বার্সেলোনাকে জেতাচ্ছিলেন একের পর এক শিরোপা। কিন্তু ২০১০ সালের পর থেকে শরীরের ওপর এই অনিয়মের প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করে। বারবার চোট পেয়ে ছন্দ হারাতে শুরু করলেন, এমনকি ম্যাচের মাঝেই মাঠে বমি করতেও দেখা গেছে তাঁকে।
২০১৪ সালে মেসির জীবনে কী পরিবর্তন এল?
২০১৪ সালে এসে মেসি বুঝলেন, এবার নিজেকে বদলাতেই হবে। ঠিক তখনই তাঁর জীবনে আগমন ইতালীয় পুষ্টিবিদ জিউলিয়ানো পোসেরের। মেসির পাতের খাবার আমূল বদলে দেওয়ার কারিগর। ২০১৪-১৫ মৌসুমটা ফুটবল বিশ্ব দেখেছে বিস্ময় নিয়ে। বার্সেলোনার হয়ে ৫৮ গোল আর ২৩ অ্যাসিস্টের চোখধাঁধানো পারফরম্যান্সে হাত ধরে এল ট্রেবল, চ্যাম্পিয়নস লিগ, লা লিগা ও কোপা দেল রে। পর্দার আড়ালে এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের পথ গড়ে দিয়েছিল পোসেরের তৈরি নতুন ডায়েট চার্ট।
পুষ্টিবিদ পোসেরের ডায়েট চার্টে কী ছিল?
আর্জেন্টাইন সতীর্থ মার্তিন দেমিচেলিসের পরামর্শে মেসির সঙ্গে কাজ শুরু করেন পোসের। শুরুতেই তিনি মেসির পুরো খাদ্যতালিকা ভেঙে নতুন ভিত্তি গড়ে দেন। পাঁচটি খাবারকে বানালেন মূল স্তম্ভ, পানি, জলপাইয়ের তেল, হোল গ্রেইন বা অখণ্ড শস্য, তাজা ফল এবং তাজা শাকসবজি। পাশাপাশি একদম কমিয়ে দিলেন চিনি আর লাল মাংসের ব্যবহার। পোসের অবশ্য শুধু খাবারেই থামেননি। মেসির শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখতে 'বাখ ফ্লাওয়ার রেমেডি' বা ভেষজ ক্বাথ এবং ইমোশনাল থেরাপির সাহায্য নেন তিনি।
ইতালির পত্রিকা 'গাজ্জেত্তা দেল্লো স্পোর্ত'কে পোসের সে সময় বলেছিলেন, 'ও প্রক্রিয়াজাত খাবার পুরোপুরি বাদ দিয়ে সেখানে ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার যুক্ত করেছে, খাদ্যশস্য, সবজি, মাছ আর জলপাইয়ের তেল। জিতেছিল সবকিছুই, তবু এই শ্রেষ্ঠত্ব দিনের পর দিন ধরে রাখার তীব্র ইচ্ছা ছিল ওর। ও বুঝেছিল, শরীরকে ধরে রাখতে গেলে কোথাও পরিবর্তন আনা দরকার। ও অসম্ভব বুদ্ধিমান আর প্রখর অনুভূতির একজন মানুষ।'
ইয়ারবা মাতে কীভাবে মেসির জীবনে এল?
পোসেরের পরামর্শে সোডা বা মিষ্টি পানীয় পুরোপুরি ছেঁটে ফেলেন মেসি। কোমল পানীয়ের জায়গায় জীবনে ঢুকে পড়ে 'ইয়ারবা মাতে'। দক্ষিণ আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী এই ভেষজ পানীয় কফির মতো শরীরের ক্লান্তি দূর করে। প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ভিটামিন বি ও সি-তে ভরপুর এই পানীয় দ্রুতই মেসির প্রিয় সঙ্গী হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাতে মাতে নিয়ে মেসির ছবি এখন হামেশাই দেখা যায়। এই মাতে পানের অভ্যাস এখন আর্জেন্টিনা দলের সংস্কৃতিতেই রূপ নিয়েছে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে তো আর্জেন্টিনা দল নিজেদের সঙ্গে প্রায় ৫০০ কেজি ইয়ারবা মাতে নিয়ে গিয়েছিল!
মেসির প্রিয় খাবারের রেসিপি কী?
বার্সেলোনায় থাকার সময় ক্লাব তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে মেসির প্রিয় খাবারের রেসিপি প্রকাশ করেছিল। খুব সাধারণ এক রেসিপি: মূলজাতীয় সবজি, জলপাইয়ের তেল আর সুগন্ধি ভেষজ দিয়ে রোস্ট করা মুরগির মাংস। রেসিপিতে লাগত ৩০ গ্রাম জলপাইয়ের তেল, পরিমাণমতো লবণ, ৪ কোয়া থেঁতো করা রসুন, ১টি পেঁয়াজ, এক আঁটি গাজর, ১টি লিক, ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম আলু, ৪টি মুরগির রান এবং সতেজ থাইম পাতা। বানানোর নিয়মটাও সহজ। ওভেন ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উত্তপ্ত করে সবজিগুলো কেটে ট্রেতে সাজিয়ে তেল ও লবণ ছিটিয়ে দিতে হয়। তারপর মুরগির মাংস ও বাকি উপাদান যোগ করে ভালোভাবে সেদ্ধ হওয়া পর্যন্ত রোস্ট করলেই তৈরি মেসির প্রিয় খাবার।
মেসির দুর্বলতা কী?
খাবার নিয়ে কঠোর নিয়ম মেনে চললেও মিষ্টির প্রতি দুর্বলতা মেসি পুরোপুরি ছাড়তে পারেননি। আর্জেন্টাইন খুদে জাদুকর নিজেই স্বীকার করেছেন, মিষ্টিজাতীয় খাবার দেখলে তিনি নিজেকে ধরে রাখতে পারেন না। চকলেট, দুলসে দে লেচে আর আইসক্রিম তাঁর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। মেসি একবার বলেছিলেন, 'মিষ্টি যেকোনো কিছুই আমার পছন্দ। চেষ্টা করি বেশি না খেতে, তবে ছেড়ে দেওয়া কঠিন।' মাঝেসাঝে সামান্য ওয়াইন পান করেন মেসি। খেলাধুলার ফাঁকে পানি পানের পাশাপাশি নিজের ব্র্যান্ড 'মাস প্লাস' নামের স্পোর্টস ড্রিংকও পান করেন।
কঠোর শাসনের মধ্যে এই একটু-আধটু ছাড়ই তাঁর জীবনের ভারসাম্য ধরে রেখেছে। ক্যারিয়ারের শুরুতে যা ছিলেন, এখন খাবারের ব্যাপারে হয়তো তিনি হাজার গুণ বেশি সচেতন। তবে চূড়ায় পৌঁছানোর এই কঠিন লড়াইয়ে জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলো কিন্তু একদম বিসর্জন দেননি মেসি। ফুটবলের এই মহানায়ক আমাদের শেখান, স্বাধীনতা মানে শুধু বাইরের শৃঙ্খল ভাঙা নয়, নিজের শরীর আর মনের ওপর নিয়ন্ত্রণও এক ধরনের স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যেমন শিখিয়েছিল আত্মনিয়ন্ত্রণের মূল্য, তেমনি মেসির এই আত্মসংযমও এক অনন্য দৃষ্টান্ত।