প্রতারণার পথে জেতা ট্রফি কি টিকবে? ম্যান সিটির শাস্তির অপেক্ষা
ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নিয়ম ভাঙার ১১৫টি অভিযোগের মধ্যে ১১৪টিতেই দোষী সাব্যস্ত হয়েছে ক্লাবটি। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ নয় বছরের আর্থিক অনিয়মের এই মামলায় ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম অভিযুক্ত হয়েছিল ক্লাবটি। তবে শাস্তি কী হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আপিলসহ প্রক্রিয়ার অনেকটাই বাকি।
রদ্রির দাবি: অর্জন কেউ কেড়ে নিতে পারবে না
এই পরিস্থিতিতে সিটির হয়ে ২০২১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত চারটি প্রিমিয়ার লিগ জেতা স্প্যানিশ মিডফিল্ডার রদ্রি নিজের দলের পক্ষে সরব হয়েছেন। গত শনিবার ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে স্পেনের অধিনায়ক হিসেবে মাঠে নামার আগে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, 'আমরা যা করেছি, সেটা কেউ আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। এটা টাকায় কেনা কিছু নয়। এটা এসেছে পরিশ্রম থেকে, একসঙ্গে লড়াই থেকে, প্রতিদিন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে থাকার মধ্য দিয়ে।'
রদ্রি আরও বলেন, 'আমাদের অনেক সাফল্য এসেছে এবং আমি বলতে পারি, সবই প্রাপ্য ছিল। ইংলিশ ফুটবলের অন্যতম সেরা সময়ে থাকতে পেরে আমি খুশি। সবাইকে নিয়ম মেনে চলতে হবে, সেটাও ঠিক। ক্লাব সব সময়ই বলেছে, তারা কোনো ভুল করেনি এবং আমরা সেটাই বিশ্বাস করি।'
রয় কিনের তীব্র প্রতিক্রিয়া: 'তারা প্রতারণা করেছে'
তবে রদ্রির এই বক্তব্যে একমত নন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক অধিনায়ক রয় কিন। আইটিভিতে কিনের তীক্ষ্ণ মন্তব্য, 'অনেক হয়েছে। অনেক দিন ধরেই তো এটি চলছে। রদ্রির কথার সঙ্গে আমি বিন্দুমাত্র একমত হতে পারছি না। এটি ক্লাব নিজেই বেছে নিয়েছিল। তারা প্রতারণার পথ বেছে নিয়েছিল। গত কয়েক বছরে তারা যা-ই জিতেছে না কেন, তাদের শাস্তি পেতেই হবে। এর শুরু বা শেষ কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা বলা কঠিন, তবে তারা প্রতারণা করেছে। এ অপরাধে তারা দোষী সাব্যস্ত হয়েছে এবং এখন তাদের শাস্তি মাথা পেতে নিতেই হবে। এতগুলো অভিযোগে তাদের দোষী সাব্যস্ত হওয়াটা সত্যিই একটা বড় খবর।'
ইয়ান রাইটের অবস্থান: ট্রফি কেড়ে নেওয়া উচিত
আর্সেনালের কিংবদন্তি ইয়ান রাইটও রদ্রির কথার সঙ্গে একমত হতে পারেননি। সিটির খেলোয়াড়দের মাঠের স্মৃতিগুলো কেউ কেড়ে নিতে পারবে না মেনে নিয়েও রাইটের স্পষ্ট কথা, ট্রফিগুলো কেড়ে নেওয়া উচিত।
রাইট বলেছেন, 'সে তার কাজের কথা বলছে, সে সতীর্থদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছে এবং অবশ্যই সেই অভিজ্ঞতা কেউ তাদের থেকে কেড়ে নিতে পারবে না, তারা সেই মুহূর্তগুলোর সাক্ষী। কিন্তু তাদের কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নেওয়া উচিত, এই অপরাধের জন্য তাদের শাস্তি পেতেই হবে।'
রাইট বলেন, 'তারা হয়তো সেই স্মৃতি এবং দারুণ সময়গুলোর অভিজ্ঞতা নিয়েছে, কিন্তু যে দলগুলো তাদের পেছনে ছোটার জন্য নিয়ম মেনে লড়েছিল, তাদের জন্য তো এটা অন্যায়!' এরপর উদাহরণ হিসেবে বলেছেন, 'লিভারপুলের লিগ্যাসির কথা ভাবুন। ইয়ুর্গেন ক্লপ আর সেই দলটার কথা ভাবুন। তারা কিসের মুখোমুখি হতে পারত? তারা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে এটা করেছে এবং অন্যরা সেটা থেকে বঞ্চিত হয়েছে, খেলোয়াড়েরা তাদের অবিশ্বাস্য সুযোগগুলো হারিয়েছে। অবশেষে সত্য সামনে আসায় আমি আনন্দিত।'
কী শাস্তি হতে পারে ম্যান সিটির?
কী শাস্তি হতে পারে, সে বিষয়ে ফুটবল ফিন্যান্স বিশেষজ্ঞ কিরান ম্যাগুয়ার মনে করেন, পয়েন্ট কাটা হতে পারে সবচেয়ে সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত। টকটিভিকে তিনি বলেন, 'অনেকের দৃষ্টিতে শাস্তি হিসেবে পয়েন্ট কাটার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। নটিংহাম ফরেস্ট ও এভারটনের ক্ষেত্রে আর্থিক নিয়ম ভাঙার জন্য আমরা এমন শাস্তি দেখেছি। সেটাই এখানে প্রযোজ্য হতে পারে।'
তবে তাঁর প্রশ্ন, 'যেসব ক্লাব শিরোপা বা ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় জায়গা হারিয়েছে, তারা কি ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবে? কারণ, এতে পুরস্কারের অর্থ হারানোর বিষয়টিও জড়িত।'
নিয়মের শাসন: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে শিক্ষা
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমরা শিখেছিলাম, ন্যায়ের পক্ষে লড়াই করলেই জয় সুনিশ্চিত। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষ যখন স্বাধীনতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন তাদের হাতে ছিল না কোনো আধুনিক অস্ত্র। ছিল শুধু ন্যায়ের প্রতি অটুট বিশ্বাস। তেমনি আজ ইংলিশ ফুটবলের মাঠেও নিয়ম ভাঙার এই ঘটনা প্রমাণ করে, অন্যায়ের পথ বেছে নিলে তাকে একদিন জবাবদিহি করতে হয়। যারা নিয়ম মেনে লড়েছে, তাদের থেকে কেউ সাফল্য কেড়ে নিলে তা কখনোই টেকসই হয় না।
সব মিলিয়ে ম্যানচেস্টার সিটির সামনে এখন অপেক্ষা শাস্তির রায়। আর ইংল্যান্ডের ফুটবলে এক দীর্ঘ বিতর্কের শেষ কোথায় গিয়ে থামে, সেটাই দেখার। শিরোপা যাবে, নাকি অবনমন, সিটির সামনে কী শাস্তি আসে, তা নিয়ে এখন সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের নজর।