আলোকচিত্রী তূর্য্য মুশফিক নিজের তৈরি একটি বক্স ক্যামেরা দিয়ে ধারণ করেছেন দ্রুত বদলে যাওয়া ঢাকার করুণ ও সংগ্রামী রূপ। 'লিভিং রুইনস' বা 'জীর্ণ শহর' সিরিজের ২২টি ছবি সম্প্রতি দৃক গ্যালারিতে 'চেঞ্জিং গ্রাউন্ডস' প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে। এই ছবিগুলো যেন একাত্তরের চেতনার মতোই টিকে থাকার এক অনবদ্য দলিল, যেখানে কংক্রিটের চাপে নিষ্পিষ্ট হয়েও আমগাছের মতো বেঁচে থাকার চেষ্টা চলে মানুষের।
বক্স ক্যামেরা বানিয়ে কেন ছবি তুলছেন তূর্য্য মুশফিক?
ডিজিটাল যুগে নিজের বানানো বক্স ক্যামেরা ব্যবহারের কারণ ব্যাখ্যা করে তূর্য্য বলেন, 'বক্স ক্যামেরা ব্যবহারের কিছু কারণ আছে। এই ক্যামেরার জন্য যে লেন্সটি বানিয়েছি, সেটি ছবিতে একধরনের ডিস্টর্টেড ভিশন তৈরি করে। আবার ছবি পেপারে তোলা, নেগেটিভ থেকে পজিটিভ করা, এরপর স্ক্যান করে ডিজিটাল রূপ দেওয়া কিংবা প্রিন্ট, এই পুরো প্রক্রিয়ায় ছবির মধ্যে যুক্ত হয় অনেক স্তর ও পরিবর্তন।' অর্থাৎ ছবিটি একের পর এক কারিগরি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায়, যা তাঁর শিল্পকর্মের ব্যক্তিগত সিগনেচার হয়ে উঠেছে।
ঢাকার মানুষের সংগ্রাম আর প্রকৃতির টিকে থাকার গল্প
গত জুলাইয়ে ঢাকার দিলু রোডে অপরাজেয় আমগাছের ছবি তুলেছিলেন তূর্য্য। তাঁর কাছে গাছটি শুধু একটি গাছ নয়, যান্ত্রিক ঢাকার টিকে থাকা সাধারণ মানুষের প্রতীকও। তূর্য্য বলেন, আমগাছটির মতোই এই শহরের মানুষকেও প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়। জীবিকার তাগিদে অনেক মানুষ প্রিয়জনদের ছেড়ে ঢাকায় এসে বসতি গড়েন। বিপুলসংখ্যক মানুষের জায়গা করে দিতে গিয়ে শহরটিও হয়ে উঠেছে নিষ্প্রাণ। যানজট, দূষণ, সবুজের অভাব ও অপরিকল্পিত নগরায়ণে অতিষ্ঠ মানুষ। তবু দিনশেষে ক্লান্ত মানুষগুলোরাই সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন।
মার্চ থেকে ঢাকার বিভিন্ন অলিগলিতে ঘুরেছেন তূর্য্য। সঙ্গে ছিল নিজের বানানো বক্স ক্যামেরা। এই ক্যামেরায় ধারণ করেছেন শহরের মানুষের জীবন, দ্রুত বদলে যাওয়া নগর আর প্রাণপ্রকৃতির ওপর তার প্রভাব।
বক্স ক্যামেরা তৈরির পেছনের গল্প
বছর দশেক আগে কৌতূহল থেকে এমন একটি বক্স ক্যামেরা বানিয়েছিলেন তূর্য্য। তখন তিনি পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী। পাঠশালার প্রয়াত শিক্ষক আনিসুর রহমান তাঁকে উৎসাহ দিয়েছিলেন। দৃকের একটি প্রদর্শনী থেকে ফেলে দেওয়া কাঠের বোর্ড দিয়ে ক্যামেরাটি বানিয়েছিলেন। তবে সেটি বাইরে নিয়ে কাজ করার উপযোগী ছিল না।
এ বছরের শুরুতে তূর্য্যের মাথায় আবার বক্স ক্যামেরা তৈরির চিন্তা আসে। মার্চে বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীদের নিয়ে কাজে নেমে পড়েন। মোহাম্মদপুরের এক কাঠমিস্ত্রিকে সঙ্গে নিয়ে দিনরাত কাজ করে তৈরি করেন ক্যামেরার কাঠামো। পাটুয়াটুলীর একটি চশমার দোকানে কয়েক ধাপে তৈরি হয় লেন্স। এরপর হালকা ওজনের লেন্স হোল্ডার তৈরির জন্য একাধিকবার যেতে হয়েছে নবাবপুরের লেদের কারখানায়। সব মিলিয়ে ক্যামেরাটি তৈরি করতে সময় লেগেছে প্রায় এক মাস।
মজা করে তূর্য্য বলেন, 'ঢাকা শহর নিয়ে আমাদের অনেক অভিযোগ। কিন্তু ঢাকার মতো এত কম খরচে এত উপকরণ এবং দক্ষ কারিগর পাওয়া যায় কি না, আমার জানা নেই। আমার ক্যামেরা তৈরির পেছনে ওই কারিগরদের অবদানও কোনো অংশে কম না।'
প্রদর্শনীতে বক্স ক্যামেরা ও বই প্রকাশ
দৃক গ্যালারির প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীদের জন্য তূর্য্যের সেই বক্স ক্যামেরাটিও রাখা আছে। ক্যামেরার পেছনের অংশ খুলে দেখালেন ভেতরের ছোট্ট ডার্করুম। অর্থাৎ ছবি তোলার পর ক্যামেরার ভেতরেই ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ায় ফিল্ম ডেভেলপ করা যায়। বক্স ক্যামেরার আলো-আঁধারি উপস্থাপনার সঙ্গে সুহৃদ সামসের তৈরি আবহ সংগীতও প্রদর্শনীতে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
প্রদর্শনীর ছবিগুলোর পেছনের গল্প নিয়ে নিজের প্রকাশনী 'লোক-আলো বুকস' থেকে একটি বইও প্রকাশ করেছেন তূর্য্য। তিনি বলেন, 'যেহেতু শিক্ষকতা করি, তাই ছবি তোলার পাশাপাশি গবেষণা ও লেখালেখিও আমাকে আকৃষ্ট করে। আমার মেন্টর ও আলোকচিত্রী সরকার প্রতীক এসব কাজে অনেক উৎসাহ দেন। ক্যামেরা তৈরির সময় প্রতিদিনের দিনলিপিও একটি ডায়েরিতে লিখে রেখেছি। ফলে কেউ এখন এ ধরনের ক্যামেরা বানাতে চাইলে আমার ডায়েরি থেকে সাহায্য নিতে পারবেন।'
ভবিষ্যৎ স্বপ্ন: একটি মানবিক ঢাকা
ছবি তোলা, শিক্ষকতা ও গবেষণার কাজ চলবে। তবে এসবের ভিড়েও তূর্য্য মুশফিকের স্বপ্ন, একদিন এমন একটি ঢাকার ছবি ফ্রেমবন্দী করবেন, যেখানে মানুষ প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারবে, শিশুরা পাবে একটি মানবিক শহর, আর প্রকৃতি বেড়ে উঠবে নিজের মতো করে। এই স্বপ্ন যেন ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনারই ধারাবাহিকতা, যেখানে স্বাধীনতা মানে শুধু রাজনৈতিক মুক্তি নয়, বরং প্রতিটি মানুষের জন্য একটি মানবিক ও সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
