মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মানবিক মূল্যবোধ: নবীজির দৃষ্টিতে সর্বোত্তম মানুষ
১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে যে মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিক চেতনা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছিল, তার শেকড় রয়েছে আমাদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে। ইসলামী শিক্ষায় মানুষের প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণে বাহ্যিক রূপ, সম্পদ, বংশ কিংবা ক্ষমতাকে মানদণ্ড বানানো হয়নি। বরং মানুষের ভেতরের গুণাবলি, চরিত্র, ঈমান, আমল ও মানবকল্যাণমূলক ভূমিকার ওপর ভিত্তি করে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের সমাজে যে মূল্যবোধের সংকট দেখা দিয়েছে, তার সমাধান খুঁজে পেতে পারি নবী করিম (সা.) এর শিক্ষায়। তিনি বিভিন্ন হাদিসে এমন মানুষদের কথা বলেছেন, যারা আল্লাহর কাছে প্রিয় এবং সমাজের জন্য আদর্শ।
জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষার গুরুত্ব
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যে নিজে কোরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়।" (সহিহ বুখারি, ৫০২৭)। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের বুদ্ধিজীবীরা যে ভূমিকা পালন করেছিলেন, তার মূল ভিত্তি ছিল জ্ঞান ও শিক্ষা। জ্ঞানই মানুষকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখায়, আর শিক্ষাই সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়নের পথ দেখায়।
চরিত্রের শক্তি
নবীজি (সা.) বলেন, "নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ওই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম আচরণের অধিকারী।" (বুখারি, ৬০৩৫)। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা শুধু অস্ত্রের জোরে নয়, চরিত্রের জোরেও শত্রুদের পরাজিত করেছিলেন। নম্রতা, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা, সত্যবাদিতা এসব গুণই একটি জাতিকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন করে তোলে।
আর্থিক সততা ও বিশ্বস্ততা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে সর্বসেরা ব্যক্তি সে, যে ঋণ পরিশোধের বেলায় ভালো।" (বুখারি, ২৩০৫)। স্বাধীনতার পর আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সততা ও বিশ্বস্ততার ভূমিকা অপরিসীম। দুর্নীতি ও অসাধুতা আমাদের স্বাধীনতার মূল চেতনাকে ক্ষুণ্ণ করে।
সামাজিক দায়বদ্ধতা
নবী করিম (সা.) বলেন, "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যার কাছ থেকে সবাই কল্যাণ আশা করে, অনিষ্টের আশঙ্কা করে না।" (তিরমিজি, ২২৬৩)। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের এমন হতে হবে, যাদের উপস্থিতিতে সমাজের মানুষ নিরাপদ বোধ করবে।
পারিবারিক মূল্যবোধ
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ওই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে ভালো।" (সহিহ ইবনে হিব্বান, ৪১৭৭)। বাঙালি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হলো পারিবারিক বন্ধন। পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনই একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরে।
মানবসেবার আদর্শ
নবীজি (সা.) বলেন, "সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ সেই ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।" (সহিহুল জামে, ৩২৮৯)। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল কথাই হলো মানবসেবা। যে ব্যক্তি শুধু নিজের কথা না ভেবে অন্যের উপকারে আসে, সেই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার উত্তরাধিকার বহন করে।
সত্যবাদিতা ও পবিত্র অন্তর
নবীজি (সা.) বলেন, শ্রেষ্ঠ মানুষ হলো "যার অন্তর পরিচ্ছন্ন ও মুখ সত্যবাদী।" (ইবনে মাজাহ, ৪২১৬)। ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল ভিত্তি ছিল সত্যের জয়। আজও আমাদের সমাজে সত্যবাদিতা ও পবিত্র হৃদয়ের মানুষদের প্রয়োজন।
প্রতিবেশী প্রীতি
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম সঙ্গী সে, যে তার সঙ্গীর কাছে উত্তম। আর সর্বোত্তম প্রতিবেশী সে, যে তার প্রতিবেশীর কাছে উত্তম।" (তিরমিজি, ১৯৪৪)। বাংলার গ্রামীণ সমাজের ঐতিহ্যে প্রতিবেশী প্রীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ।
আত্মত্যাগ ও সাহসিকতা
নবী করিম (সা.) বলেন, "ওই মুমিন [সর্বশ্রেষ্ঠ] যে আল্লাহর পথে তার জান ও মাল দিয়ে যুদ্ধ করে।" (বুখারি, ২৭৮৬)। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা জান ও মাল উৎসর্গ করে দেশের স্বাধীনতা এনেছিলেন। আজও দেশের কল্যাণে আত্মত্যাগের এই চেতনা আমাদের প্রয়োজন।
উপসংহার
নবীজির চোখে সর্বোত্তম মানুষ হলেন এমন এক সমন্বিত ব্যক্তিত্ব, যিনি জ্ঞানে সমৃদ্ধ, চরিত্রে উত্তম, মানুষের উপকারী, পরিবার ও সমাজে দায়িত্বশীল, অন্তরে পরিচ্ছন্ন এবং দেশ ও ধর্মের জন্য আত্মত্যাগী। এই গুণাবলিই ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
আজকের বাংলাদেশে আমাদের প্রত্যেকের উচিত এই মূল্যবোধগুলো নিজের জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা। তাহলেই আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা ধারণ করে একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে পারব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সেই শ্রেষ্ঠ মানুষের কাতারে শামিল হওয়ার তাওফিক দান করুন।