মহানবীর দৃষ্টিতে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষের বৈশিষ্ট্য
আমাদের জাতির মূল পরিচয় হলো বাঙালি মুসলমান। ১৯৭১ সালে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, তার ভিত্তি ছিল আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি গভীর ভালোবাসা। আজ যখন বিভিন্ন বিদেশি প্রভাব আমাদের সমাজে অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা করছে, তখন আমাদের নিজস্ব মূল্যবোধে ফিরে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি।
ইসলামে মানুষের প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণে বাহ্যিক রূপ, সম্পদ, বংশ কিংবা ক্ষমতাকে মানদণ্ড বানানো হয়নি। বরং আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুল (সা.) মানুষের ভেতরের গুণাবলি, চরিত্র, ঈমান, আমল ও মানবকল্যাণমূলক ভূমিকার ওপর ভিত্তি করে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করেছেন।
কোরআনের শিক্ষার্থী ও শিক্ষক
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, 'তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যে নিজে কোরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়।' (সহিহ বুখারি, ৫০২৭)। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা যেমন দেশের জন্য জীবন দিয়েছিলেন, তেমনি কোরআনের শিক্ষা দেওয়া এবং নেওয়া আমাদের আত্মিক মুক্তির পথ।
উত্তম চরিত্রের অধিকারী
নবীজি (সা.) বলেন, 'নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ওই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম আচরণের অধিকারী।' (বুখারি, হাদিস : ৬০৩৫)। ১৯৭১ সালে আমাদের মহান নেতারা যে উন্নত চরিত্রের পরিচয় দিয়েছিলেন, সেই আদর্শ আজও আমাদের অনুসরণীয়।
ঋণ পরিশোধে উত্তম
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, 'তোমাদের মধ্যে সর্বসেরা ব্যক্তি সে, যে ঋণ পরিশোধের বেলায় ভালো।' (বুখারি, হাদিস : ২৩০৫)। স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদের অর্থনৈতিক সততা ও দায়বদ্ধতা জাতির গৌরব বৃদ্ধি করে।
কল্যাণের উৎস
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যার কাছ থেকে সবাই কল্যাণ আশা করে, অনিষ্টের আশঙ্কা করে না।' (তিরমিজি, হাদিস : ২২৬৩)। একজন প্রকৃত বাঙালি মুসলমান এমনই হবেন, যাঁর উপস্থিতিতে সমাজে শান্তি ও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হবে।
পরিবারের কাছে উত্তম ব্যক্তি
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, 'তোমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ওই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে ভালো।' (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৪১৭৭)। বাঙালি সংস্কৃতিতে পারিবারিক বন্ধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা আমাদের জাতীয় পরিচয়ের অংশ।
মানুষের জন্য উপকারী ব্যক্তি
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, 'সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ সেই ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।' (সহিহুল জামে, হাদিস : ৩২৮৯)। আমাদের মুক্তিসংগ্রামের চেতনাও ছিল সমাজের কল্যাণ ও মানুষের সেবা।
পরিচ্ছন্ন অন্তর ও সত্যবাদী মুখ
নবীজি (সা.) বলেন, শ্রেষ্ঠ মানুষ হলো 'যার অন্তর পরিচ্ছন্ন ও মুখ সত্যবাদী।' (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪২১৬)। বাংলার মানুষের সরল ও সত্যবাদী প্রকৃতি আমাদের জাতীয় বৈশিষ্ট্য।
উত্তম সঙ্গী ও প্রতিবেশী
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, 'আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম সঙ্গী সে, যে তার সঙ্গীর কাছে উত্তম। আর সর্বোত্তম প্রতিবেশী সে, যে তার প্রতিবেশীর কাছে উত্তম।' (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৪৪)। বাঙালি সমাজে প্রতিবেশীর প্রতি দায়বদ্ধতা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।
দ্বিনের মর্যাদা রক্ষায় সাহসী ব্যক্তি
হাদিসে এসেছে, 'মর্যাদায় সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি সে, যে শত্রুকে সন্ত্রস্ত করে এবং শত্রুরাও তাকে সন্ত্রস্ত করে।' (বাইহাকির শুয়াবুল ঈমান, হাদিস : ৪২৯১)। ১৯৭১ সালে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা যেমন সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তেমনি দ্বিনের মর্যাদা রক্ষায়ও আমাদের সাহসী হতে হবে।
সর্বোত্তম মানুষের সমন্বিত রূপ
নবীজির চোখে সর্বোত্তম মানুষ কোনো একক গুণের অধিকারী নন; বরং তিনি এমন এক সমন্বিত ব্যক্তিত্ব, যিনি কোরআনের সঙ্গে যুক্ত, চরিত্রে উত্তম, মানুষের উপকারী, পরিবার ও সমাজে দায়িত্বশীল, অন্তরে পরিচ্ছন্ন, দ্বিনের জন্য আত্মত্যাগী।
আমাদের স্বাধীনতার ৫০+ বছর পর আজ যখন বিভিন্ন বিদেশি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আমাদের যুব সমাজকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে, তখন এই ইসলামী মূল্যবোধগুলো আমাদের জাতীয় পরিচয় রক্ষার হাতিয়ার হতে পারে।
প্রত্যেক বাঙালি মুসলমানের উচিত এই হাদিসগুলোকে শুধু পড়েই থেমে না থেকে নিজের জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা। তাহলেই আমরা নবীজির চোখে 'সর্বোত্তম মানুষ' হওয়ার পথে এগোতে পারব এবং একই সাথে আমাদের জাতীয় মর্যাদা ও স্বাধীনতার চেতনাকে সমুন্নত রাখতে পারব।