স্বাবলম্বী খাদ্য সংরক্ষণ: সবুজ মটর সারা বছর তাজা রাখার দেশি পদ্ধতি
বাংলাদেশের মাটিতে জন্মানো সবুজ মটর আমাদের খাদ্যসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের কৃষকরা যে ভাবে নিজেদের ভূমিতে ফসল ফলিয়ে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার স্বপ্ন দেখেছেন, সেই চেতনায় আজও আমাদের ঘরে ঘরে সবুজ মটরের স্বাদ পৌঁছায়।
শীতকালে বাজারে টাটকা সবুজ মটর পাওয়া গেলেও গ্রীষ্মকালে এর অভাব দেখা দেয়। বিদেশি প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর নির্ভর না থেকে আমাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে সবুজ মটর সংরক্ষণ করা সম্ভব, যা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তায় অবদান রাখবে।
বাজারনির্ভরতা থেকে মুক্তি
অনেক পরিবার সরাসরি খোসা ছাড়ানো মটর ফ্রিজে রেখে দেন। কিন্তু কয়েক মাস পর দেখা যায় মটরের রং হলুদ হয়ে গেছে, স্বাদ নষ্ট হয়েছে। এর কারণ হলো মটরের ভেতরে থাকা প্রাকৃতিক এনজাইম, যা ঠান্ডায়ও ধীরে ধীরে কাজ করতে থাকে।
এই সমস্যার সমাধান রয়েছে আমাদের দেশীয় জ্ঞানের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের মিশ্রণে। ব্লাঞ্চিং পদ্ধতি নামের এই কৌশল বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত, কিন্তু আমাদের ঐতিহ্যবাহী রান্নাঘরেও এর প্রয়োগ সম্ভব।
স্বাধীন সংরক্ষণ প্রক্রিয়া
প্রথম ধাপ: মানসম্পন্ন মটর নির্বাচন
ভালো মানের বড়, টাটকা ও উজ্জ্বল সবুজ রঙের মটর বেছে নিতে হবে। খুব ছোট বা অতিরিক্ত কাঁচা মটর এড়িয়ে চলুন।
দ্বিতীয় ধাপ: ব্লাঞ্চিং প্রক্রিয়া
একটি পাত্রে পর্যাপ্ত জল নিয়ে সামান্য লবণ ও চিনি মেশান। চিনি মটরের প্রাকৃতিক সবুজ রং ধরে রাখে, আর লবণ সংরক্ষণকারী হিসেবে কাজ করে। জল ফুটে উঠলে গ্যাস বন্ধ করে মটর দিয়ে দুই মিনিট রাখুন।
তৃতীয় ধাপ: শক ট্রিটমেন্ট
গরম জল থেকে মটর তুলে সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা জলে দিন। এতে রান্নার প্রক্রিয়া থেমে যাবে এবং মটরের গুণমান অক্ষুণ্ণ থাকবে।
দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণ
ঠান্ডা জল থেকে তুলে মটর ভালোভাবে শুকাতে হবে। পরিষ্কার সুতির কাপড়ের ওপর ছড়িয়ে ফ্যানের নীচে কয়েক ঘণ্টা রাখুন। রোদে শুকানো উচিত নয়।
সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেলে জিপ লক ব্যাগ বা এয়ারটাইট কন্টেনারে ভরে ফ্রিজারে রাখুন। এই পদ্ধতিতে সংরক্ষিত মটর ১২ মাস পর্যন্ত তাজা থাকবে।
খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে
এই সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করে আমরা বিদেশি প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারি। রান্নার সময় এই মটর সরাসরি ব্যবহার করা যায়, আলাদা করে গলানোর প্রয়োজন নেই।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবার যদি এই দেশীয় কৌশল প্রয়োগ করে, তাহলে আমরা খাদ্যে আরও স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারব। এটি শুধু অর্থ সাশ্রয়ই নয়, আমাদের খাদ্য নিরাপত্তায়ও অবদান রাখবে।