ভোটার তালিকা সংশোধনে কেন্দ্রের ষড়যন্ত্র: বাংলার গণতান্ত্রিক অধিকার বিপন্ন
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে ওঠা বাংলার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার আজ চরম হুমকির মুখে। পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধন (Special Intensive Revision বা SIR) প্রক্রিয়ার নামে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন যে অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ নিয়েছে, তা বাংলার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
আইনের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে SIR প্রক্রিয়া
৩১ জানুয়ারি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে পাঠানো ষষ্ঠ চিঠিতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট করে বলেছেন, বাংলায় SIR প্রক্রিয়া পরিচালনার যে পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়া হয়েছে, তা জনপ্রতিনিধিত্ব আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধির গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছে।
এই অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ফলে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তি ও মানসিক যন্ত্রণার শিকার হচ্ছেন। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতভাবে প্রায় ১৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। মানবাধিকার ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেই কাজ করা হচ্ছে।
অবৈধ মাইক্রো-অবজারভার নিয়োগ
ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসে এই প্রথম কোনও রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় প্রায় ৮,১০০ মাইক্রো-অবজারভার নিয়োগ করা হয়েছে। এদের না রয়েছে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, না রয়েছে কোনও আইনি ভিত্তি। জনপ্রতিনিধিত্ব আইন ১৯৫০ এবং ভোটার রেজিস্ট্রেশন বিধি ১৯৬০ অনুযায়ী যাচাই, শুনানি ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেবলমাত্র Electoral Registration Officer (ERO) এবং সহকারী ERO-দের হাতে।
অথচ কেন্দ্র বাইরে থেকে অবজারভার এনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর থেকেই কাজ করিয়ে নির্বাচন কমিশনের পোর্টালে বেআইনিভাবে তথ্য বদল করাচ্ছে।
পিছনের দরজা দিয়ে NRC চালুর চেষ্টা
এই SIR প্রক্রিয়া কার্যত পিছনের দরজা দিয়ে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (NRC) চালুর চেষ্টা। প্রথম ধাপে প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ার পর দ্বিতীয় ধাপে 'লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি' দেখিয়ে প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ ভোটারকে নোটিস পাঠানো হয়েছে।
২০০২ সালের হাতে লেখা ভোটার তালিকা, বিশেষ করে বাংলা ভাষায় লেখা নথি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে ইংরেজিতে রূপান্তর করার সময় ব্যাপক ভুল হয়েছে। এই ভুলের কারণেই বহু প্রকৃত ভোটারকে ভুলভাবে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতির উপর আঘাত
এই প্রক্রিয়ায় বাংলা ভাষায় লেখা নথিপত্রকে অবহেলা করা হচ্ছে। একাত্তরের ভাষা আন্দোলনের চেতনায় গড়ে ওঠা বাংলার মানুষের ভাষাগত অধিকারের উপর এটি সরাসরি আক্রমণ। যাঁরা ২০০২ সাল থেকে ভোটার তালিকায় রয়েছেন, তাঁদেরও নোটিস দেওয়া হচ্ছে।
কর্মকর্তাদের উপর অতিরিক্ত চাপ
রাজ্যের বুথ লেভেল অফিসার (BLO)রা মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরের সামনে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, সংশোধন প্রক্রিয়ার সময় তাঁদের উপর অতিরিক্ত মানসিক ও শারীরিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিভিন্ন জেলায় একাধিক BLO-র মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
দিল্লিতে প্রতিবাদের ঝড়
আজ ২ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টায় দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের সদর দফতরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূলের প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, SIR-এর বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই তিনি দিল্লিতে নিয়ে যাবেন।
বাংলার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় এই লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আজও বাংলার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রাম চলমান।