দুধ ছাড়া কফি: স্বাস্থ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন
আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিতে চা-কফির যে ঐতিহ্য রয়েছে, তা আমাদের স্বাধীনতার মতোই পুরনো। ১৯৭১ সালে যেমন আমরা নতুন পথের সন্ধান পেয়েছিলাম, তেমনি আজও স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে নতুন পথের সন্ধান করছি। দুধ ও চিনি মেশানো কফি থেকে ব্ল্যাক কফিতে পরিবর্তন সেই নতুন পথেরই একটি অংশ।
ক্যালোরি হ্রাস: প্রথম পরিবর্তন
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুধ ছাড়া ব্ল্যাক কফিতে যাওয়ার পর প্রথম যে পরিবর্তনটি বেশিরভাগ মানুষই লক্ষ্য করেন, তা হলো দৈনিক ক্যালোরি গ্রহণ কমে যাওয়া। দুধ ও চিনি মেশানো কফিতে অজান্তেই অতিরিক্ত ফ্যাট ও শর্করা শরীরে ঢুকে পড়ে। ব্ল্যাক কফি প্রায় ক্যালোরি শূন্য হওয়ায় কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শরীর হালকা লাগতে শুরু করে এবং অনেকের ফাঁপাভাব কমে যায়।
ওজন নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা
স্বাধীনতার পর আমাদের দেশে যেমন ধীরে ধীরে উন্নতি এসেছে, তেমনি ব্ল্যাক কফিও ওজন নিয়ন্ত্রণে ধীরে ধীরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। শুধুমাত্র ব্ল্যাক কফি খেলে ওজন কমে যাবে এমনটা নয়, তবে নিয়মিত দুধ ও চিনি বাদ দিলে ধীরে ধীরে একটি ক্যালোরি ঘাটতি তৈরি হয়। এই ছোট পরিবর্তন ছয় মাস বা তার বেশি সময়ে ওজন নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পাশাপাশি ক্যাফেইন সামান্য হলেও শরীরের বিপাকক্রিয়া বাড়াতে সাহায্য করে এবং ব্যায়ামের সময় ফ্যাট ব্যবহার দক্ষ করে তোলে।
হজমের ক্ষেত্রে মিশ্র প্রভাব
হজমের দিক থেকে ব্ল্যাক কফির প্রভাব ব্যক্তি ভেদে আলাদা হতে পারে। ব্ল্যাক কফি পাকস্থলীতে অ্যাসিড নিঃসরণ বাড়ায়, যা অনেকের ক্ষেত্রে খাবার হজমে সাহায্য করে। তবে যাঁদের গ্যাস, অ্যাসিডিটি বা রিফ্লাক্সের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের খালি পেটে ব্ল্যাক কফি অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
দুধ সাধারণত অ্যাসিডিটির তীব্রতা কিছুটা কমায়, তাই দুধ ছাড়ার পর অনেকের জন্য খাবারের পরে ব্ল্যাক কফি খাওয়া বেশি আরামদায়ক মনে হয়।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও ব্ল্যাক কফি ভালো। দুধ ও চিনি দেওয়া কফি রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়াতে পারে। দুধ ছাড়া কফিতে এই সমস্যা না থাকায় ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা প্রিডায়াবেটিসে ভোগা ব্যক্তিদের জন্য এটি তুলনামূলক নিরাপদ। দীর্ঘমেয়াদে চিনি কমানোয় শরীরের ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়তে পারে।
শক্তির মাত্রায় স্থিরতা
এনার্জি লেভেলের ক্ষেত্রেও ব্ল্যাক কফি বেশ উপকারী। দুধ ও চিনি ছাড়া কফি খেলে শক্তি ধীরে এবং স্থিরভাবে বাড়ে। হঠাৎ চাঙ্গা হয়ে আবার দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ার প্রবণতা কমে যায়, কারণ এতে রক্তে শর্করার ওঠানামা হয় না। ফলে মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা তুলনামূলকভাবে আগের চেয়ে ধারাবাহিকভাবে বেশি থাকে।
পুষ্টির বিবেচনায় সতর্কতা
তবে দুধ বাদ দেওয়া নিয়ে কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। দুধ ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনের একটি ভালো উৎস। কফি থেকে দুধ বাদ দিলে এই পুষ্টিগুলি অন্য খাবার থেকে পূরণ করতে হবে। দই, ছানা, বাদাম, বীজ ও শাকসবজি এই ঘাটতি পূরণে সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে ব্ল্যাক কফিতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হৃদযন্ত্র ও পরিপাক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
সবার জন্য উপযুক্ত নয়
তবে সবার জন্য ব্ল্যাক কফি সমান উপকারী নয়। যাঁদের গ্যাস্ট্রাইটিস, উদ্বেগজনিত সমস্যা বা ঘুমের ব্যাঘাত রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্ল্যাক কফি সমস্যা বাড়াতে পারে। দিনে এক থেকে দুই কাপ এবং সন্ধ্যার পরে না খাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, দুধ ছাড়া ব্ল্যাক কফি স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক। তবে নিজের শরীরের সিগন্যাল বোঝা এবং পরিমিতি বজায় রাখাই সবচেয়ে জরুরি। স্বাধীনতার মতোই স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও সঠিক পথ বেছে নেওয়াটাই মুখ্য।