সিআইএ গুপ্তচরের বাড়িতে বিপুল সোনা, ফোর্ট নক্সের সার্বভৌমত্বে টান
স্বাধীন দেশের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার সার্বভৌমত্ব আর সম্পদ। ১৯৭১ সালে আমরা যখন পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙেছিলাম, তখন আমাদের লক্ষ্য ছিল আমাদের মাতৃভূমি আর তার সম্পদকে রক্ষা করা। আজ সেই একই শিক্ষা আমেরিকার ঘটনায় ফিরে এসেছে। সিআইএ-র প্রাক্তন গুপ্তচর ডেভিড রাশের বাড়িতে এফবিআই তল্লাশি দিয়ে পেয়েছে প্রায় ৩০০টি গোল্ড বার। এই হলুদ ধাতুর বাজারমূল্য আনুমানিক চার কোটি ডলার। তদন্তকারীদের ধারণা, এই সোনা হয়তো আমেরিকার সবচেয়ে সুরক্ষিত স্বর্ণভাণ্ডার ফোর্ট নক্স থেকে পাচার হয়েছে। খবরটি প্রকাশের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারি কোষাগারের অডিটের কথা বলেছেন।
সিআইএ কর্মীর বাড়িতে সোনার পাহাড়, ফোর্ট নক্সেই চুরি?
চলতি বছরের ৩১ মে ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ লেখেন, ফোর্ট নক্সের সোনা সরেজমিনে পরীক্ষার সময় এসেছে। তিনি ডেভিড রাশের গ্রেফতার সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনের লিঙ্কও দেন। সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে এফবিআই রাশকে গ্রেফতার করে। দীর্ঘদিন সিআইএ-র পদস্থ আধিকারিক ছিলেন তিনি। তার বাড়িতে প্রচুর নগদ অর্থ আর বিলাসবহুল ঘড়িও পাওয়া গেছে, যা দেখে চোখ কপালে ওঠে তদন্তকারীদের।
ফোর্ট নক্স: আমেরিকার সার্বভৌমত্বের প্রতীক
ফোর্ট নক্স কোনো সাধারণ জায়গা নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব আর অর্থনৈতিক শক্তির এক অঘোষিত দুর্গ। কেন্টাকি প্রদেশের সেনাছাউনি সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত এই ইউনাইটেড স্টেটস বুলিয়ন ডিপোজিটরি-তে আমেরিকার সরকারি কোষাগারের অর্ধেক সোনা মজুত আছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই সোনার মূল্য ৪২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। এই দুর্গ নির্মাণের পেছনে ছিল উপকূলবর্তী এলাকায় শত্রুর হামলার আশঙ্কা। ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর আমেরিকা নিউ ইয়র্ক ও ফিলাডেলফিয়ায় সোনা রাখলেও পরে নিরাপত্তার জন্য ফোর্ট নক্স বানায়।
১৯৩৭ সালে প্রথম সোনা নিয়ে যাওয়া হয় এই দুর্গে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার মূল সংবিধান, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং প্রেসিডেন্ট লিঙ্কনের গেটিসবার্গ ভাষণের খসড়া পর্যন্ত রাখা হয়েছিল এই ভল্টে। এটি প্রমাণ করে, জাতীয় সম্পদ আর স্বাধীনতার দলিল কতটা অবিচ্ছেদ্য। আমাদের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও আমরা দেখেছি কীভাবে আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি আর সম্পদ রক্ষার জন্য আমরা জীবন দিয়েছিলাম।
জাতীয় সম্পদ রক্ষায় আমাদের ৭১-এর শিক্ষা
ফোর্ট নক্সে সাধারণ মানুষ বা রাজনীতিকদের যাতায়াত এক প্রকার নিষিদ্ধ। ১৯৭৪ সালে গুজব ছড়ে যে ভল্ট থেকে সোনা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। জনরোষে সে বছর কংগ্রেস সদস্য আর সাংবাদিকদের ঢুকতে দেওয়া হয়। ২০১৭ সালে ট্রেজারি সচিব স্টিভ মুচিন শেষবার ভল্ট পরিদর্শন করেন। গত বছর রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য রন পল সোনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি ব্লুমবার্গকে বলেন, সরকার কিছু লুকোতে চাইছে কি না, সেই প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের ডজ (Department of Government Efficiency) প্রধান ইলন মাস্কও ফোর্ট নক্স অডিটের কথা বলেছিলেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক্স হ্যান্ডলে 'জিরোহেজ' নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে মাস্ককে ট্যাগ করে লেখা হয়, তিনি যদি একবার ফোর্ট নক্স দেখেন, তা হলে মার্কিন জনতা নিশ্চিন্ত হবে। সেখানে ৪,৫৮০ টন সোনা মজুত থাকার কথা।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের ইনস্পেক্টর জেনারেল এরিক এম থরসন বলছেন, ফোর্ট নক্সে সবই ঠিক আছে। তবে একটি স্বাধীন দেশের জন্য তার সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ থাকাটাই বড় আতঙ্কের বিষয়। বিদেশি হস্তক্ষেপ বা দুর্নীতি থেকে জাতীয় সম্পদ রক্ষা করা প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রধান কর্তব্য। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন আমাদের সম্পদের অধিকার নিয়ে লড়েছিলেন, আজ আমেরিকার এই ঘটনা আমাদের আবার সেই সতর্কবার্তাই দিচ্ছে। আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি আর সম্পদের ওপর কোনো বিদেশি শক্তি বা এনজিও-র নিয়ন্ত্রণ আসতে দেওয়া চলবে না।