বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি এখনও আমাদের রক্তে। ১৯৭১ সালের সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আমাদের শিখিয়েছে, ভূ-রাজনীতির হিসাব-নিকাশ কতটা জটিল হতে পারে। আজ আমরা এমন এক অঞ্চলের কথা বলব, যার ইতিহাস আমাদের নিজেদের ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িত। বাহরিন। পারস্য উপসাগরের এই ছোট দ্বীপরাষ্ট্রটি কি একসময় ভারতের অংশ ছিল? হ্যাঁ, ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বাহরিন ছিল ব্রিটিশ ভারতেরই একটি অংশ। আর এই কারণেই ইরানের সঙ্গে বাহরিনের শত্রুতার শিকড় এত গভীর।
বাংলাদেশের মতো বাহরিনেরও একসময় ভারতীয় পাসপোর্ট ছিল। ১৯৪৭ সালের আগে বাহরিনের বাসিন্দাদের দেওয়া হতো ভারতীয় পাসপোর্ট। আর ১৯৪৭ সালের পরও সেখানে দীর্ঘদিন ভারতীয় টাকাই প্রচলিত ছিল। ইতিহাসের বইয়ে এই বিষয়গুলো খুব একটা পড়ানো হয় না। কিন্তু এই ইতিহাস না বুঝলে বর্তমানের ভূ-রাজনীতি বোঝা অসম্ভব।
বাহরিন কোথায়? সেখানে কার শাসন?
বাহরিন আসলে একটি দ্বীপপুঞ্জ। এর একদিকে সৌদি আরব, আর পারস্য উপসাগরের ওপারে ইরান। বহু শতাব্দী আগে এই অঞ্চল পারস্য সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। কিন্তু ১৭৮৩ সালে আরবের আল খলিফা পরিবার বাহরিন আক্রমণ করে এবং সেখানে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করে। বাহরিনের অধিকাংশ মানুষ শিয়া মুসলিম, ঠিক ইরানের মতো। কিন্তু শাসক আল খলিফা রাজপরিবার সুন্নি। ইরান কখনও এই বাস্তবতাকে পুরোপুরি মেনে নেয়নি।
ব্রিটিশ ভারতের অধীনে বাহরিনের অবস্থান
ভারতের মতো আলাদা উপনিবেশ হিসেবে নয়, বরং বাহরিন ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গেই যুক্ত ছিল। এর প্রশাসনিক তদারকি হতো দিল্লি থেকে। ব্রিটিশ শাসনকালে জয়পুর, হায়দরাবাদ, যোধপুরের মতো দেশীয় রাজ্যের সঙ্গেই বাহরিনকেও যুক্ত করা হয়েছিল। সেখানে রাজপরিবারের শাসন থাকলেও তারা ছিল ব্রিটিশ ভারতের অধীন। সরকারি আধিকারিকরা নয়াদিল্লি থেকে পাঠানো হতো এবং তাঁরা ছিলেন আইপিএস (IPS) কর্মকর্তা। তখন IPS-এর অর্থ ছিল ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল সার্ভিস (Indian Political Service)। বাহরিনে একজন ব্রিটিশ পলিটিক্যাল এজেন্ট থাকতেন, যিনি সরাসরি নয়াদিল্লিতে রিপোর্ট পাঠাতেন।
ইরানের দাবি এবং ব্রিটিশদের সিদ্ধান্ত
১৯২৭ সালে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটেনের কাছে দাবি জানায় যে বাহরিন তাদের অংশ। কিন্তু ব্রিটেন সেই দাবি খারিজ করে দেয়। ১৯৪৭ সালে যখন ব্রিটিশ ভারত ভাগ হওয়ার প্রশ্ন ওঠে, তখন উপসাগরীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। দেশীয় রাজ্যগুলিকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছিল -- তারা ভারত না পাকিস্তানে যোগ দেবে। কিন্তু উপসাগরীয় রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রে কী হবে, তা নিয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত ছিল না।
ব্রিটিশরা ভারত ছাড়ার সময় ওই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে চেয়েছিল। তাই তারা ১৯৪৭ সালের ১ এপ্রিল, অর্থাৎ ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টির চার মাস আগে, উপসাগরীয় অঞ্চলকে ব্রিটিশ ভারত থেকে আলাদা করে দেয়। ফলে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন হলেও ওই অঞ্চলকে ব্রিটিশ শাসনের অধীনেই রাখা হয় এবং তার প্রশাসন সরাসরি লন্ডন থেকে পরিচালিত হতে থাকে।
জাতিসংঘের সিদ্ধান্তে বাহরিনের স্বাধীনতা
ইরানের শাহ জাতিসংঘের কাছে আবেদন করেন যে বাহরিনের উপর ইরানের অধিকার রয়েছে। জাতিসংঘ সিদ্ধান্ত নেয়, বাহরিনের জনগণের মতামত নেওয়া হবে। গণভোটের মাধ্যমে ঠিক হবে তারা স্বাধীন থাকতে চায়, নাকি ইরানের সঙ্গে যুক্ত হতে চায়। জনগণ স্বাধীনতার পক্ষেই ভোট দেয়। ফলে ১৯৭১ সালে বাহরিন একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
আমেরিকার প্রবেশ এবং বাহরিন-ইরান শত্রুতার নতুন অধ্যায়
১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর আয়াতোল্লাহদের সরকার আবার পুরনো দাবি সামনে আনতে শুরু করে। বাহরিনের অভিযোগ ছিল, ইরান তাদের রাজপরিবারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে উসকানি দিচ্ছে। এরপর বাহরিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করে। বাহরিনেই যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের (Fifth Fleet) প্রধান সদর দফতর স্থাপন করা হয়, যা পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন নৌবাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। ইরান এটিকে নিজেদের জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা-হুমকি বলে মনে করে। তাই যখনই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত তৈরি হয়, ইরানের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হয়ে ওঠে বাহরিনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলি।
শেষ কথা: ইতিহাসের শিক্ষা
বাংলাদেশের মতো বাহরিনেরও স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে, ভূ-রাজনীতির হিসাব-নিকাশ কতটা জটিল হতে পারে। ইরান ও বাহরিনের এই শত্রুতা শুধু সাম্প্রতিক বছরের নয়, কিংবা কেবল বর্তমান যুদ্ধের ফলও নয়। এর শিকড় বহু শতাব্দী ধরে বিস্তৃত। এই বিরোধের আগুন দীর্ঘদিন ধরেই জ্বলছে। এটাই মূল কথা।