মুক্তির বার্তায় মানব উন্নয়নের অগ্রদূত সেলিম জাহান
‘চূড়ান্ত বিচারে মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয় তার নিজের চয়িত কর্মকাণ্ডে, কেবল ভাগ্যচালিত ঘটনায় নয়’ — এটাই ছিল প্রয়াত মাহবুব উল হকের বিশ্বাস। ব্যক্তিগত জীবন, পেশাগত কর্মজীবন কিংবা উন্নয়ন-দর্শন — সব ক্ষেত্রেই তিনি এই বিশ্বাস ধারণ করেছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূলে রয়েছে মানুষের নিজের ভাগ্য নিজে গড়ার এই দর্শন।
মাহবুব উল হক কে ছিলেন?
মাহবুব উল হক একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন; কৈশোরে উপমহাদেশের বিভাজনের ভয়াবহ অস্থিরতা ও গণহত্যার সাক্ষী হয়েছিলেন; এবং এমন এক সময়ে বেড়ে উঠেছিলেন, যখন সদ্য স্বাধীন দেশগুলো নানা দিক থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। কিন্তু তিনি কখনোই ভাগ্যের ঘটনাগুলোকে নিজের সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রক হতে দেননি। তিনি গভীর আবেগের সঙ্গে ‘জীবনের সুযোগের সমতা’র পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা ও সামাজিক বিদ্বেষকে তিনি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। শান্তি, নিরাপত্তা এবং মানুষের কল্যাণের প্রতি তিনি ছিলেন অবিচলভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ।
মানব উন্নয়নের ধারণা কী?
মানব উন্নয়নের ধারণার মূল ভিত্তি হলো: মানুষই একটি জাতির প্রকৃত সম্পদ। উন্নয়নের মৌলিক লক্ষ্য এমন অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে মানুষ দীর্ঘ, সুস্থ ও সৃজনশীল জীবন উপভোগ করতে পারে। মানব উন্নয়ন মানুষের পছন্দ ও সম্ভাবনার পরিধি সম্প্রসারণের একটি প্রক্রিয়া। উন্নয়নের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য শুধু উচ্চতর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা নয়; বরং প্রত্যেক মানুষের জন্য সম্ভাব্য বিকল্প ও সুযোগের ক্ষেত্র প্রসারিত করাও।
মানব উন্নয়নের তিনটি মৌলিক বিষয় কী কী?
মানব উন্নয়নের ধারণা সম্পর্কে মাহবুব উল হক তিনটি মৌলিক বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতেন। প্রথমত, মানুষের বিকল্প ও সুযোগ তখনই বিস্তৃত হয়, যখন তারা অধিকতর সক্ষমতা অর্জন করে এবং সেই সক্ষমতা কাজে লাগানোর জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ পায়। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ, কিন্তু কখনোই উন্নয়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। তৃতীয়ত, মানুষের চয়নের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মানব উন্নয়ন ধারণা স্বীকার করে যে মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
মানব উন্নয়ন সূচক কীভাবে তৈরি হলো?
১৯৯০ সালে মাহবুব উল হকের নেতৃত্বে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি প্রথম মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এটি ছিল বিশ্বের সামনে মানব উন্নয়নের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপনের একটি নমিত প্রচেষ্টা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে মানব উন্নয়ন সম্পর্কিত বিভিন্ন সূচক, পরিসংখ্যান ও পরিমাণগত তথ্যকে সম্মিলিতভাবে মানব উন্নয়নের হিসাব-নিকাশ বলা যেতে পারে। কিন্তু তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে এই হিসাবের শুধু একটি ব্যাপ্ত মাত্রিকতা নয়, এর একটি সারসংক্ষেপমূলক মাত্রিকতাও থাকা উচিত। সেই প্রচেষ্টার ফলেই সৃষ্টি হয় বিশ্বখ্যাত মানব উন্নয়ন সূচক।
মানব উন্নয়নের চূড়ান্ত বিচার
চূড়ান্ত বিচারে, মানব উন্নয়ন হলো মানুষের উন্নয়ন, মানুষের জন্য উন্নয়ন এবং মানুষের দ্বারা উন্নয়ন। মানুষের উন্নয়ন বলতে মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি বোঝায়। মানুষের জন্য উন্নয়ন বলতে বোঝায় যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অবশ্যই মানুষের যাপিত জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দেবে। আর মানুষের দ্বারা উন্নয়ন জোর দেয় যে মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে এমন প্রক্রিয়াগুলোতে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও প্রভাব বিস্তার নিশ্চিত করতে হবে।
মাহবুব উল হকের এই দর্শন আজকের বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূলে রয়েছে মানুষের নিজের ভাগ্য নিজে গড়ার এই দর্শন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে মানুষকে, কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়।