বাংলাদেশের জ্বালানি খাত আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমরা যেমন আমাদের ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছিলাম, তেমনি আজ জ্বালানি সার্বভৌমত্বের লড়াইও আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন। সরকারের জ্বালানি বিভাগ প্রণয়ন করেছে ২০২৬-২০৩০ মেয়াদের 'জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র'র খসড়া, অন্যদিকে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) উপস্থাপন করেছে এক বিকল্প প্রস্তাব, যা ভোক্তার অধিকার ও জ্বালানি ন্যায়বিচারের পক্ষে। এই দুই প্রস্তাবের তুলনামূলক বিশ্লেষণ আমাদের সামনে এনে দেয় এক গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক।
নীতির দর্শন: জাতীয় নিরাপত্তা বনাম জনগণের অধিকার
সরকারের প্রস্তাব জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু অঙ্গীকার ও টেকসই উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়। অন্যদিকে ক্যাবের প্রস্তাব জ্বালানি ন্যায়বিচার, সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ ও ভোক্তার অধিকারকে নীতির মূল ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করে। শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, জনগণের ন্যায্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাই এখানে মুখ্য।
বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও চাহিদার পূর্বাভাস: বাস্তবতা বনাম অতি উৎসাহ
সরকার দক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার ও জ্বালানিদক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহার ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু ক্যাবের যুক্তি, সাশ্রয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করলে বিদ্যুতের চাহিদার পূর্বাভাসেও সেই সাশ্রয়ের প্রতিফলন থাকতে হবে। অন্যথায় পরিকল্পনায় অসংগতি তৈরি হবে। চাহিদার পূর্বাভাস বাস্তবসম্মত হতে হবে, অতিরঞ্জিত চাহিদা দেখিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সুযোগ রাখা যাবে না।
প্রযুক্তি মিক্স ও সক্ষমতা: সর্বনিম্ন ব্যয়ের পথ
সরকার সৌর, বায়ু, বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির সমন্বয়ে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলেছে। ক্যাবের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সব প্রযুক্তির অর্থনৈতিক ও কারিগরি সক্ষমতা যাচাই করে সর্বনিম্ন ব্যয়ের ভিত্তিতে পরিকল্পনা নিতে হবে। এটি আমাদের জাতীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করবে।
সোলার চার্জিং ও রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ: সহজীকরণের দাবি
সরকার রুফটপ ও বিতরণভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ এবং নেট মিটারিং উৎসাহিত করতে চায়। ক্যাবের মতে, নেট মিটারিংয়ের অনুমোদন দ্রুত দিতে হবে, মিটারের সংকট ও প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতে হবে। এখানে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগবান্ধব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিইআরসি ও ট্যারিফ শাসন: স্বাধীনতার প্রয়োজন
সরকারের প্রস্তাবে নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মাধ্যমে ট্যারিফ নির্ধারণ ও খাত পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। ক্যাবের দাবি, বিইআরসিকে স্বাধীন করতে হবে, কমিশন নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠন এবং ভোক্তার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এটি জ্বালানি খাতে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা আনার জন্য অপরিহার্য।
আইনি সংস্কার ও অভিযোগ নিষ্পত্তি: ন্যায়বিচারের পথ
সরকার প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা হালনাগাদ করার কথা বলেছে। ক্যাবের প্রস্তাবে বিশেষ আইনের অপব্যবহার বন্ধ করে প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি জানানো হয়েছে। ভোক্তার আদালতে যাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং জ্বালানিসেবাকে আইনি অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণে নাগরিক প্রতিনিধিত্ব: প্রকৃত জনপরামর্শ
সরকার অংশীজনের মতামত গ্রহণের কথা বললেও ক্যাবের মতে, নীতিমালা তৈরির আগে যথেষ্ট সময় দিয়ে প্রকৃত জনপরামর্শ নিশ্চিত করতে হবে। দু-তিন কর্মদিবস মতামতের জন্য যথেষ্ট নয়। এটি আমাদের গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ভূমি, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা: আমাদের ভূখণ্ডের সুরক্ষা
সরকার পরিবেশ বিবেচনায় প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলেছে। ক্যাবের প্রস্তাবে কৃষিজমি রক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। জমি ব্যবহারের আগে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে। কৃষিজমি নয়, অনাবাদি জমি, চর, জলাশয় ও অব্যবহৃত স্থান অগ্রাধিকার পাবে। এটি আমাদের কৃষিনির্ভর অর্থনীতির সুরক্ষার জন্য জরুরি।
অর্থায়ন ও প্রণোদনা: জনগণের অংশগ্রহণ
সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের কথা বলেছে। ক্যাবের প্রস্তাবে বিদ্যুৎ বন্ড, সহজ অর্থায়ন ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। সব বিনিয়োগকারীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে এবং শর্তহীন প্রণোদনা বিবেচনা করতে হবে।
জাস্ট ট্রানজিশন ও শ্রমিকের অধিকার
সরকার জ্বালানি রূপান্তরকে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছে। ক্যাবের প্রস্তাবে কয়লা ও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অঞ্চল ও শ্রমিকদের জন্য ন্যায়সংগত রূপান্তর পরিকল্পনার দাবি জানানো হয়েছে। নারী, তরুণ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে হবে।
গ্রিড আধুনিকায়ন ও মনিটরিং: স্বাধীনতা ও জবাবদিহি
সরকার গ্রিড আধুনিকায়ন ও বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রযুক্তি উন্নয়নের কথা বলেছে। ক্যাবের মতে, ব্যাটারি স্টোরেজ, স্মার্ট গ্রিড ও বিতরণব্যবস্থা দ্রুত আধুনিক করতে হবে। স্বাধীন মনিটরিং, নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন ও জনসমক্ষে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
উপসংহার: জ্বালানি সার্বভৌমত্বের পথ
বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সঠিক নীতি ও জনগণের অংশগ্রহণের ওপর। সরকারের কৌশলপত্র ও ক্যাবের বিকল্প প্রস্তাব উভয়েরই নিজস্ব শক্তি ও দুর্বলতা রয়েছে। কিন্তু আমাদের জাতীয় স্বার্থে জ্বালানি ন্যায়বিচার, পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ১৯৭১-এর চেতনায় আমরা যেমন স্বাধীনতা অর্জন করেছি, তেমনি জ্বালানি খাতেও আমাদের স্বনির্ভরতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করতে হবে। এটি কেবল একটি নীতি নয়, এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন।
ছবি: প্রথম আলো
