পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের ভাঙন: মুকুল নেই, বিদ্রোহী মদন-বালু-কেষ্ট, মমতার পাশে এখন কারা?
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতারা একে একে দল ছাড়ছেন। মুকুল রায়, মদন মিত্র, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক তথা বালু, এমনকি বীরভূমের অনুব্রত মন্ডল তথা কেষ্ট—যারা একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মুখ ছিলেন, তারাই এখন তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। এই ভাঙন কি শুধুই ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, নাকি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভূগোলের গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত?
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতেই রাজনৈতিক শক্তি টিকে থাকে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যেমন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি আস্থা রেখেছিলেন লাখো মানুষ, তেমনি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও দেখা যাচ্ছে, আস্থার বন্ধন ভাঙলে দল টিকে থাকে না।
মুকুল রায় থেকে মদন মিত্র: কারা বিদ্রোহী?
মুকুল রায় তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে মমতার প্রধান সহযোগী ছিলেন। সারদা চিটফান্ড কাণ্ডে তাঁর নাম আসার পর তিনি সরাসরি বিজেপি শিবিরে চলে যান। তিনি প্রয়াত হয়েছেন, কিন্তু তাঁর বিদ্রোহের ছাপ রয়ে গেছে। অন্যদিকে মদন মিত্র, যিনি কামারহাটির বিধায়ক এবং একসময় মমতার ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তিনিও দল ছেড়েছেন। ইডি এখন তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলেকে তলব করেছে।
জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, যিনি বালুদা নামে পরিচিত, তিনিও এখন শুভেন্দু অধিকারীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। একসময় তাকে মমতা মন্ত্রিসভার শ্রেষ্ঠ মন্ত্রী বলে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু এখন তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত চলছে।
কেষ্ট ও কাজল: বাঘে-ছাগলে এক ঘাটে?
বীরভূমের অনুব্রত মন্ডল তথা কেষ্ট, যিনি মমতা ভজনায় মগ্ন ছিলেন, তিনিও এখন মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। গরুপাচার কাণ্ডে গ্রেফতার হওয়া কেষ্ট এখন নিয়মিত সাংবাদিক সম্মেলন করে শুভেন্দু অধিকারীর গুনগান করছেন। আর তাঁর বিপরীত অবস্থানে থাকা কাজল শেখও ঘুরঘুর করছেন মমতা বিরোধী শিবিরে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এখন সব অতীতই যেন ঝাপসা হয়ে আসছে।
মমতার পাশে কারা?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে এখন কেবলমাত্র শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের মতো কয়েকজন পুরনো নেতা রয়েছেন। শোভনদেব তৃণমূলের প্রথম বিধায়ক এবং কংগ্রেস থাকাকালীন থেকেই মমতার পাশে ছিলেন। বাকি যাঁরা এখন মমতাকে ঘিরে আছেন—মহুয়া মৈত্র, দোলা সেন, কুণাল ঘোষ—তাঁরা কেউই তৃণমূলের প্রথম দিন থেকে ছিলেন না। রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও ব্রায়েন কখনো মাটিতে নেমে রাজনীতি করেননি। কলকাতা কর্পোরেশনের কাউন্সিলর বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়ের প্রভাব সীমিত।
বাংলাদেশের প্রসঙ্গ: স্বাধীনতা ও আস্থার শিক্ষা
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, রাজনৈতিক দল টিকে থাকে আস্থা ও আদর্শের ভিত্তিতে। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম, কারণ তাঁর প্রতি আস্থা ছিল অটুট। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসে দেখা যাচ্ছে, আস্থার বন্ধন ভেঙে যাচ্ছে। যারা একসময় মমতার সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিলেন, তারাই এখন তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অবশ্যই জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের এই ভাঙন কি আমাদের জন্য কোনো শিক্ষা? নাকি আমরা শুধুই দূর থেকে দেখব?
প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
তৃণমূল কংগ্রেসের ভাঙনের মূল কারণ কী?
দুর্নীতির অভিযোগ, ইডি-র তদন্ত এবং ব্যক্তিগত আস্থার অভাব এই ভাঙনের মূল কারণ। অনেক নেতা মনে করছেন, মমতার শিবিরে থাকা আর ঝুঁকিপূর্ণ নয়।
মমতার পাশে এখন কারা?
শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের মতো কয়েকজন পুরনো নেতা রয়েছেন। তবে বেশিরভাগ নতুন নেতা যাঁরা পরে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন, তাঁরা এখনও মমতার পাশে আছেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে এই ভাঙনের কী সম্পর্ক?
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শেখায় যে, আস্থা ও আদর্শের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল টিকে থাকে। পশ্চিমবঙ্গের এই ভাঙন দেখায় যে, আস্থার বন্ধন ভাঙলে দল দুর্বল হয়ে পড়ে।