পরিবারের কলহে শিশুর পা মুচড়ে দেওয়া: নরসিংদীর ঘটনা আমাদের কী শেখায়?
আসিফ রহমান
১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর আমরা যে স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ে তুলেছি, সেখানে আজও পরিবারের কলহের বলি হচ্ছে নির্দোষ শিশুরা। নরসিংদীর মাধবদীতে তিন মাস বয়সী এক শিশুর পা মুচড়ে দেওয়ার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এই ঘটনা শুধু একটি পারিবারিক অপরাধ নয়, এটি আমাদের সমাজের গভীর ক্ষতের প্রতিচ্ছবি।
ঘটনার বিবরণ: কী ঘটেছে নরসিংদীতে?
১১ জুলাই নরসিংদী সদর উপজেলার মাধবদীতে একটি একান্নবর্তী পরিবারে এই ঘটনা ঘটে। ভিডিওতে দেখা যায়, এক নারী বিছানায় শোয়া শিশুটির গায়ের কাপড় সরিয়ে বাম পা বের করে মুচড়ে দিচ্ছেন। পরে তিনি দ্রুত কক্ষ ত্যাগ করেন।
মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কামাল হোসেন বিবিসি বাংলাকে জানান, অভিযুক্ত নারী পলাতক। তার বাবা ও স্বামীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
পারিবারিক কলহ: কেন শিশুদের ওপর নৃশংসতা?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলছেন, “বড়দের মধ্যে শত্রুতা বা মনোমালিন্য তৈরি হলে একজন আরেকজনের ওপর প্রতিশোধ নিতে পারে না। তখন তারা দুর্বল ও আবেগের জায়গা অনুসন্ধান করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুর ওপরই প্রতিশোধ নেওয়া হয়।”
একান্নবর্তী পরিবারে দুই জায়ের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও ঝগড়া ছিল এই ঘটনার মূল কারণ। শিশুটির মা জানান, “আমাদের দুই জায়ের মধ্যে একটু ঝগড়া হইছিল ওইদিন। ওই রাগে একটু করছিল হয়তো।”
ইউনিসেফের প্রতিবেদন: বাংলাদেশে শিশু সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র
ইউনিসেফের ২০২৪ সালের ২৩ জুন প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে ৯টিই প্রতি মাসে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়। বিশ্বব্যাপী ৫ বছরের কম বয়সী ৪০ কোটি শিশু নিয়মিত শারীরিক শাস্তি সহ্য করে।
পুলিশের ভূমিকা: আইন ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
ওসি মোহাম্মদ কামাল হোসেন জানান, পরিবারটি মামলা করতে চায়নি। তারা ভিডিওটি ডিলিট করে দেয়। পুলিশ ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য মোবাইল জব্দ করেছে। ২০১৩ সালের শিশু আইনের ৭০ ধারায় মামলা করা হয়েছে, যাতে শাস্তি পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা।
তিনি বলেন, “একান্নবর্তী পরিবারে বড় ভাই, ছোট ভাই একসাথে ভাত খায়। তারা বলে কিছুই হয়নি, এআই দিয়ে করা হয়েছে। এটা সামাজিক অপরাধ, শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা।”
চিকিৎসা প্রতিবেদন: শিশুর শারীরিক অবস্থা
নরসিংদী সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ফরিদা গুলশানারা কবির জানান, শিশুটির পায়ের এক্সরে করা হয়েছে। আঘাতের কারণে কোনো ইনজুরি বা ক্ষত পাওয়া যায়নি। তবে শিশুটি জন্মগতভাবে কিছু সমস্যায় ভুগছে।
আমাদের করণীয়: স্বাধীন বাংলাদেশের দায়িত্ব
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের শেখায় মানবিক মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচার। অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলছেন, “মানবিকতা বহির্ভূত মনস্তত্ত্ব ওই নারীর মধ্যে কাজ করেছে। পরিবার মামলা না করলেও রাষ্ট্র বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মামলা করতে হবে।”
বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা এসব ঘটনাকে উৎসাহিত করে। দ্রুত বিচার ও সামাজিক সচেতনতা ছাড়া আমরা এই নৃশংসতা রোধ করতে পারব না। ১৯৭১ সালে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, সেই স্বাধীনতা অর্থহীন যদি আমাদের শিশুরা পরিবারের কলহের শিকার হয়।