আমেরিকার সামরিক আগ্রাসন এবং আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মুঠো মুঠো করে শক্তি জমা রেখেছে ইরান। শান্তি আলোচনার মুখরায়তায় বসেও পরাশক্তির চোখে আঙুল দেখিয়ে অস্ত্রের জবাব দেখিয়েছে তেহরান। কূটনৈতিক চাপের মাঝেও নিজেদের স্বাধীনতা এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি এই দৃঢ় মনোভাব আমাদের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়। স্বাধীনতাকামী মানুষ কখনোই পরাশক্তির কাছে মাথা নত করে না।
অসম যুদ্ধের কৌশল: মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি যেখানে বাঁচে
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিশাল সামরিক শক্তির সামনে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা গেরিলা কৌশল বেছে নিয়েছিলেন। অসম লড়াইয়ের সেই একই রণকৌশল, অর্থাৎ 'Asymmetric Warfare', এখন প্রয়োগ করতে চাইছে ইরান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বিমানবাহী রণতরী বা অত্যাধুনিক Destroyer-এর বিরুদ্ধে ইরানি নৌবাহিনীর অস্ত্র হল ছোট, দ্রুতগামী এবং ক্ষেপণাস্ত্রবাহী Speedboat-এর ঝাঁক। মুক্তিযুদ্ধের মতোই, এখানেও লড়াইটা বলপীড়নের বিরুদ্ধে, সার্বভৌমত্বের পক্ষে।
'২৭ রজব': স্বাধীনতার সলিল সমাধি যার নয়
চলতি বছরের মে মাসে তেহরানের 'রেভলিউশন স্কোয়ার'-এ ইরান তাদের এই নতুন হাতিয়ার '২৭ রজব'-কে প্রকাশ্যে আনে। এটি সাধারণ কোনো নৌকা নয়, বরং ক্ষেপণাস্ত্র-সজ্জিত দ্রুতগামী আক্রমণকারী রণতরী। এই ছোট্ট কিন্তু প্রাণঘাতী Speedboat-গুলোর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটার। ৩ মিটার উঁচু ঢেউয়ের মধ্যেও পূর্ণ গতিতে কাজ করতে পারে এগুলো। প্রতিটি নৌকা ভারী সামরিক সরঞ্জামে সজ্জিত। রয়েছে Anti-Ship Cruise Missile, যার পাল্লা ৭০০ কিলোমিটার। সমুদ্রের নীচ দিয়ে আঘাত হানতে সক্ষম হালকা ওজনের টর্পেডোও রয়েছে এগুলোতে।
রাডার ব্যবস্থার বিভ্রান্তি এবং ঝাঁক বেঁধে আক্রমণ
একটি আধুনিক মার্কিন Destroyer একসঙ্গে কয়েকটি বড় জাহাজ বা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে ধ্বংস করতে পারে। কিন্তু যখন ১০০ থেকে ১৫০টি ছোট এবং দ্রুত গতির Speedboat চারপাশ থেকে একযোগে ধেয়ে আসে, তখন যুদ্ধজাহাজের অত্যাধুনিক Radar এবং কম্পিউটার সিস্টেম বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। কোনটিকে ছেড়ে কোনটিকে নিশানা করবে, তা নির্ধারণ করার আগেই বোটগুলো জাহাজের রক্ষণাত্মক সীমানায় ঢুকে পড়ে। এটি ঠিক সেই কৌশল, যেখানে ছোটরা একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে বড় শত্রুকে পঙ্গু করে দেয়।
অর্থনৈতিক সাশ্রয়: স্বাধীনতার মূল্য যেখানে অনেক কম
আমেরিকার একটি Guided-Missile Destroyer বানাতে খরচ হয় প্রায় ২০০ কোটি ডলার। অন্য দিকে, ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্রবাহী Speedboat-এর খরচ মাত্র কয়েক লাখ ডলার। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি একটি বড় জাহাজ ডোবাতে ৫০টি স্পিডবোটও হারায়, তাও কৌশলগত ও অর্থনৈতিক ভাবে আমেরিকার মতো সুপার পাওয়ারকে মাত দেবে সার্বভৌম রাষ্ট্রটি। এই সস্তা কিন্তু কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রমাণ করে, স্বাধীনতা রক্ষার জন্য হাজার হাজার কোটি খরচ করা সবসময় জরুরি নয়, বরং সঠিক কৌশল এবং সাহসিকতাই মুক্তির চাবি।
হরমুজ প্রণালী: সার্বভৌমত্বের সুরক্ষিত দুয়ার
হরমুজ প্রণালীর সবচেয়ে সঙ্কীর্ণ অংশটি মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া, যার মধ্যে জাহাজ চলাচলের নিরাপদ অংশ মাত্র ৩ কিলোমিটার। এই সরু জায়গায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল আকারের Destroyer বা Cruiser-গুলো তাদের পূর্ণ গতি বা কার্যক্ষমতা দেখাতে অক্ষম। গত কয়েক সপ্তাহে ট্রাম্পের সামরিক বাহিনী বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তার অজুহাতে সেখানে অতিরিক্ত নৌসেনা মোতায়েন করেছে। ঠিক সেই সময়ই বিশ্বের সামনে ইরান তাদের নতুন অস্ত্রটি প্রকাশ্যে এনেছে। এটি স্পষ্ট বার্তা যে, কোনো বিদেশি শক্তি কোনো সার্বভৌম দেশের জলসীমানায় আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না।
যেকোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব হলো নিজের ভূমি ও জলসীমার সুরক্ষা। বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়ার এই সাহস যেকোনো স্বাধীনতাকামী জাতির গৌরব। ইরানের এই প্রতিরোধ আমাদের শেখায়, স্বাধীনতা কখনো কাউকে দান করা হয় না, তা অর্জন করতে হয়, আর রক্ষা করতে হয় নিজের শক্তিতে।
