২১ জুলাই কমিশনের রিপোর্ট পেশ: শহীদ পরিবারের প্রতি সুবিচারের নতুন অধ্যায়
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ২১ জুলাই ১৯৯৩ সালের মহাকরণ অভিযান ও পুলিশের গুলিচালনার ঘটনায় গঠিত সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্ট বিধানসভায় পেশ করেছেন। এই রিপোর্ট পেশের মাধ্যমে ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়ের সত্য সামনে এলো। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ধারণকারী আমাদের মতো জাতির জন্য এই ঘটনার শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কমিশন রিপোর্টে কী উঠে এসেছে?
সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্টে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। কমিশন মোট ৪৪ জনকে তলব করেছিল, যাদের মধ্যে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, মণীশ গুপ্ত, তুষারকান্তি তালুকদার, বিমান বসু, সোমেন্দ্রনাথ মিত্র, মদন মিত্র, সৌগত রায়ের মতো বড় রাজনৈতিক নেতারা ছিলেন।
কমিশন স্পষ্টভাবে বলেছে যে মহাকরণ থেকে বহু দূরে মেয়ো রোড, রেড রোড, ডোরিনা ক্রসিং, এসপ্ল্যানেডে অবস্থানরত জনতার উপর গুলিচালনা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়, উস্কানিবিহীন ও অযৌক্তিক ছিল। তৎকালীন পুলিশ কমিশনার তুষারকান্তি তালুকদারের রিপোর্ট অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কার নির্দেশে গুলি চলেছিল তা প্রকাশে তিনি অস্বীকার করেছেন। এমনকি তৎকালীন বিদ্যুৎমন্ত্রী বা প্রশাসনিক শীর্ষ পদস্থ কর্তাদের বাঁচাতে ফাইল ও নথি গায়েব করা হয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তার বক্তব্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম না করলেও স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন, ''২১ জুলাইয়ের আবেগ ও শহীদদের রক্তকে ব্যবহার করে অনেকেই নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাজনৈতিক আখের গুছিয়েছেন, কিন্তু শহীদ পরিবারগুলি আজ চরম উপেক্ষিত।''
তিনি আরও বলেন, ''শুধু রাজনৈতিক পদ বা সরকারি ক্ষমতা নয়, ব্যক্তিগত বিষয় সম্পত্তি, আমেরিকায় গিয়ে চোখের চিকিৎসা, চার্টার্ড ফ্লাইটে ঘোরা, হরিশ চ্যাটার্জি ও হরিশ মুখার্জি স্ট্রিটে ৩৮টা প্লটের মালিক হওয়া, অসংখ্য প্রাসাদের মতো বাড়ি তৈরি করা -- অনেক অনেক কিছু করে নিয়ে গেছেন।''
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে কমিশন তৎকালীন আন্দোলনকারী মূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডাকার প্রয়োজনই মনে করেনি। অথচ প্রয়াত বিরোধী দলনেতা পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায় কমিশনে সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করে বলেছিলেন যে গুলি চালানোর জন্য একমাত্র দায়ী ব্যক্তি ছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব মণীশ গুপ্ত, যাকে পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হয়।
শহীদ পরিবারদের জন্য নতুন করে সুবিচার
কমিশন নিহত ১২ জন শহীদের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু তৃণমূল সরকার নিহতদের মাত্র ২ লক্ষ এবং আহতদের মাত্র ১৫ হাজার টাকা দিয়েছিল। বর্তমান সরকার কমিশনের সুপারিশ মেনে নিহতদের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে প্রদান করবে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলি চাইলে এই ঘটনার বিরুদ্ধে নতুন করে এফআইআর দায়ের করার সুযোগ বর্তমান সরকার দেবে।
আমপান ও কোভিডের দুর্নীতির রিপোর্টও আসবে
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন যে ২১ জুলাইয়ের রিপোর্ট ছাড়াও তার কাছে আমপানের ক্যাগ রিপোর্ট এবং কোভিডকালীন মেডিক্যাল সরঞ্জাম কেনার দুর্নীতি সংক্রান্ত একাধিক চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট হাতে এসেছে। আগামী দিনে বিধানসভার টেবিলেই সেই সমস্ত নথি জনসমক্ষে আনা হবে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার থেকে আমরা শিখি যে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের এই ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও জনগণের রক্তের রাজনীতি কখনোই টেকসই হয় না।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
২১ জুলাই কমিশনের রিপোর্ট কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এই রিপোর্ট ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই মহাকরণ অভিযানে পুলিশের গুলিচালনার ঘটনার সত্য উদঘাটন করেছে এবং শহীদ পরিবারদের জন্য সুবিচারের পথ খুলে দিয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা কী ছিল?
কমিশন তৎকালীন আন্দোলনকারী মূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডাকার প্রয়োজন মনে করেনি। তবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেছেন যে তিনি এই ঘটনার আবেগ ও শহীদদের রক্তকে নিজের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করেছেন।
শহীদ পরিবাররা কী ক্ষতিপূরণ পাবে?
বর্তমান সরকার কমিশনের সুপারিশ মেনে নিহতদের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান করবে।
ছবি: আনন্দবাজার পত্রিকা