ক্যামাক স্ট্রিটে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ: অভিষেকের জেরা ঘিরে তৃণমূল-বিজেপি সংঘাতের নতুন অধ্যায়
কলকাতার ক্যামাক স্ট্রিটে তৃণমূল কংগ্রেসের দফতর থেকে বিলবোর্ড খুলতে গিয়ে যে ঘটনা ঘটেছে, তা এখন রাজনৈতিক সংকটের নতুন রূপ নিয়েছে। মঙ্গলবার শেক্সপিয়র সরণি থানায় প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর তৃণমূল নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করতেই তাঁর দফতরে হাজার পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। এই ঘটনা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালির গণতান্ত্রিক অধিকারের লড়াইয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
বিলবোর্ড খুলতে হাজার পুলিশ কেন?
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে কলকাতা পুরসভার আধিকারিকেরা ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেকের দফতর থেকে একটি বিলবোর্ড খুলতে যান। পুরসভার দাবি, বিলবোর্ডটি বিপজ্জনকভাবে ঝুলছিল, তাই তা খুলে নেওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অভিষেক ও তাঁর অনুগামীরা পুরকর্মীদের কাজে বাধা দেন বলে অভিযোগ ওঠে। পুলিশের সহায়তায় পুর আধিকারিকেরা দফতরে ঢোকার সময় অশান্তি হয়, এবং পুলিশ ও পুরকর্মীদের মারধরের অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের বিরুদ্ধে।
থানায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ
পুলিশি তলবের পর মঙ্গলবার দুপুর সওয়া ১২টায় শেক্সপিয়র সরণি থানায় হাজিরা দেন অভিষেক। দুপুর ১২টা ১৭ মিনিটে থানার ভিতরে ঢোকেন তিনি। সন্ধ্যা নাগাদ থানা থেকে বেরিয়ে অভিষেক বলেন, ''একটা সাইন বোর্ড নামানোর জন্য কলকাতা পুলিশের কার্যত ১০০০ কর্মী পাঠানো হয়েছে। গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করার জন্য করা হয়েছে।''
থানা থেকে বেরিয়ে অভিষেক আরও বলেন, এক মাস আগে এই তৎপরতা দেখানো হলে নিউ মার্কেটের হোটেলে প্রাণহানি ঘটত না। তিনি আলিপুরে ইভিএম পুড়ে যাওয়ার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তাঁর কথায়, ''নির্বাচনের ফলঘোষণার এক মাস পরে আলিপুরে ৪০০০ কন্ট্রোল ইউনিট পুড়ে গেল। তখন ফায়ার অডিটই হয়নি।''
মহিলা পুলিশের শ্লীলতাহানির অভিযোগ ও পাল্টা দাবি
ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনায় অভিষেকদের বিরুদ্ধে মহিলা পুলিশ কর্মীদের শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার থানা থেকে বেরিয়ে অভিষেক পাল্টা দাবি করেন, তাঁদের ১৩ জন কর্মীকে 'অবৈধভাবে' গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁর কথায়, ''নোটিস ছাড়া গ্রেফতার করা হয়েছে। এভাবে গ্রেফতার করা যায় না। অনেক পদ্ধতিগত ত্রুটি রয়েছে।'' পাশাপাশি তিনি জানান, ঘটনার দিনের ভিডিও তাঁদের কাছে রয়েছে, যেখানে দেখা গিয়েছে তাঁদের কর্মীদের সিঁড়ি দিয়ে টেনে হিঁচড়ে নামানো হয়েছে। তবে তিনি পুলিশ কর্মীদের দোষ দেন না, কারণ তাঁরা কর্তব্য পালন করছেন।
বিজেপির বিরুদ্ধে সরাসরি আঙুল
থানা থেকে বেরিয়ে অভিষেক সরাসরি বিজেপির দিকে আঙুল তোলেন। তিনি বলেন, ''মানুষের ভোটে জিতে এলে এত ভয় কিসের? বিজেপি জানে মানুষের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসেনি।'' তিনি জানান, ভোটের পর দিন থেকে তৃণমূলের বিধায়ক, সাংসদ ভাঙানো হচ্ছে। গ্রামসভা, অ্যাকাউন্ট, সমিতি, দলীয় দফতর ভাঙা হচ্ছে। তাঁর কথায়, ''যদি ভাবে মিথ্যা মামলায় আমাদের জেলে ভরে তৃণমূলকে শেষ করবে, তা হলে ভুল করবে।''
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারিকেও নিশানা করেছেন অভিষেক। তিনি বলেন, ''বাংলার কি দুর্ভাগ্য! মুখ্যমন্ত্রীকে টিভির পর্দায় ঘুষ নিতে দেখা গিয়েছে। সুদীপ্ত সেন (সারদাকর্তা) অভিযোগ করেন, তিনি ফেরার হওয়ার আগে ৬ কোটি টাকা নিয়ে গিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী।''
তিনটি এফআইআর ও তলব
ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনায় শেক্সপিয়র সরণি থানায় তিনটি এফআইআর দায়ের হয়েছে। তার মধ্যে একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন পুরসভার আধিকারিক, অন্যটি পার্ক স্ট্রিট থানার এক সার্জেন্ট। অভিযোগ, অভিষেকের দফতরে সরকারি আধিকারিকদের কাজে বাধা দেওয়া এবং মারধর করা হয়েছে। এমনকি, মহিলা পুলিশকর্মীদের হেনস্থা, শ্লীলতাহানির চেষ্টার মামলাও রুজু হয়েছে। তার পরেই বাড়িতে নোটিস দিয়ে তলব করা হয় অভিষেক, ডেরেক ও'ব্রায়েন, বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়, প্রাক্তন বিধায়ক হুমায়ুন কবীর, অভিষেকের পিএ সুমিত রায়কে। ডেরেক হাজিরা না দিলেও মঙ্গলবার শেক্সপিয়র সরণি থানায় যান অভিষেক।
বাংলার গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
এই ঘটনা শুধু একটি রাজনৈতিক সংঘাত নয়, এটি বাংলার গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। ১৯৭১ সালে বাঙালি যে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিল, সেই স্বাধীনতার চেতনা আজও আমাদের পথ দেখায়। যেকোনো সরকারের উচিত জনগণের কণ্ঠরোধ না করে তাদের কথা শোনা। এই ঘটনা প্রমাণ করে, গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আমাদের সজাগ থাকতে হবে।