নবম পে-স্কেল: মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার কারিগরদের ন্যায্য অধিকার
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, সেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এলো ঐতিহাসিক নবম পে-স্কেল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে দেশের উন্নয়নের রথের সারথি হিসেবে যারা কাজ করেন, তাদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মন্ত্রিসভা এই পে-স্কেল অনুমোদন করেছে। এতে বেতন বৃদ্ধি পাচ্ছে ১০০ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত, যা বাস্তবায়ন হবে দুই অর্থবছরে তিনটি ধাপে।
নবম পে-স্কেলে কোন গ্রেডে কত বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে?
সরকারি চাকরিতে আগের মতোই ২০টি গ্রেড বহাল থাকছে। সর্বনিম্ন স্তর ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার টাকায়, অর্থাৎ এই গ্রেডে বেতন বেড়েছে ১৪২ শতাংশ। এই গ্রেডের সর্বোচ্চ বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৮ হাজার ৪০০ টাকা।
অন্যদিকে, সরকারি চাকরির সর্বোচ্চ স্তর প্রথম গ্রেডের বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকায়। এই বেতন কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিচার বিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্য আলাদা বেতন কাঠামোও অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা।
কবে থেকে কার্যকর হবে নতুন বেতন স্কেল?
সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে এই নবম পে-স্কেল অনুমোদন করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি সংবাদ সম্মেলনে জানান, জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ এর আওতায় আগামী ১লা জুলাই ২০২৬ থেকে ১লা জুলাই ২০২৭ এর মধ্যে মূল বেতন মোট তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। ভাতাসমূহ ১লা জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর হবে।
কোন গ্রেডে কত শতাংশ বেতন বৃদ্ধি পেল?
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি জানান, ১১তম গ্রেড পর্যন্ত বেতন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এরপর থেকে ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধির হার বেড়েছে। ১২তম গ্রেডে ১১৫ শতাংশ, ১৩তম গ্রেডে ১১৮ শতাংশ, ১৪তম গ্রেডে ১৩০ শতাংশ, ১৫তম এবং ১৬তম গ্রেডে ১৩৫ শতাংশ, ১৭তম গ্রেডে ১৩৮ শতাংশ, ১৮তম গ্রেডে ১৩৯ শতাংশ, ১৯তম গ্রেডে ১৪১ শতাংশ এবং ২০তম গ্রেডে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি পেয়েছে।
পেনশনভোগীদের জন্য কী সুখবর রয়েছে?
দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের সাথে যারা জড়িত, সেই প্রবীণ নাগরিকদের কথা চিন্তা করে সরকার পেনশন কাঠামোতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। যারা আগে মাসে ৯ হাজার টাকা পেনশন পেতেন, তারা এখন পাবেন ১৮ হাজার টাকা, অর্থাৎ নিট পেনশন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন স্ল্যাবে পেনশন বৃদ্ধির হার ৫৫ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ২০৩০ সালে গিয়ে সবাই একই হারে এক গ্রেড এক পেনশন পদ্ধতিতে পেনশন পাবেন।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অগ্রাধিকার কী?
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি জানান, বেতনস্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বল্প আয় বিবেচনায় ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার প্রদান করা হবে। এছাড়া এবারই প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালু হতে যাচ্ছে, যার আওতায় মাসে তিন হাজার টাকা ভাতা প্রদান করা হবে। পূর্বে শুধুমাত্র পঞ্চম গ্রেডের কর্মচারীরা মোবাইল বিলের ভাতা পেতেন, কিন্তু নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী সকল গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই ভাতা পাবেন।
নতুন পে-স্কেলে বিভিন্ন গ্রেডের বেতন কাঠামো
নবম পে-স্কেল অনুযায়ী, দ্বিতীয় গ্রেডে মূল বেতন এক লাখ ৩২ হাজার থেকে এক লাখ ৫৩ হাজার টাকা, তৃতীয় গ্রেডে এক লাখ ১৩ হাজার থেকে এক লাখ ৪৮ হাজার ৮০০ টাকা। চতুর্থ গ্রেডে এক লাখ থেকে সর্বোচ্চ এক লাখ ৪২ হাজার ৪০০ টাকা এবং পঞ্চম গ্রেডে ৮৬ হাজার থেকে এক লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ টাকা বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে।
ষষ্ঠ গ্রেডে মূল বেতন ৭১ হাজার থেকে এক লাখ ৩৪ হাজার টাকা, সপ্তম গ্রেডে ৫৮ হাজার থেকে এক লাখ ২৬ হাজার ৮০০ টাকা। অষ্টম গ্রেডে ৪৬ হাজার থেকে এক লাখ ১০ হাজার ৮০০ টাকা এবং নবম গ্রেডে ৪৪ হাজার থেকে এক লাখ পাঁচ হাজার ৯০০ টাকা বেতন হবে।
দশম গ্রেডে মূল বেতন ৩২ হাজার থেকে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা এবং ১১তম গ্রেডে ২৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার ৫০০ টাকা। ১২তম গ্রেডে ২৪ হাজার ৩০০ থেকে ৫৮ হাজার ৭০০ টাকা, ১৩তম গ্রেডে ২৪ হাজার থেকে ৫৮ হাজার টাকা এবং ১৪তম গ্রেডে ২৩ হাজার ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ৫৬ হাজার ৮০০ টাকা বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে।
১৫তম গ্রেডে ২২ হাজার ৮০০ থেকে সর্বোচ্চ ৫৫ হাজার ২০০ টাকা এবং ১৬তম গ্রেডে ২১ হাজার ৯০০ থেকে সর্বোচ্চ ৫২ হাজার ৯০০ টাকা। ১৭তম গ্রেডে ২১ হাজার ৪০০ থেকে ৫১ হাজার ৯০০ টাকা এবং ১৮তম গ্রেডে ২১ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার ৯০০ টাকা। ১৯তম গ্রেডে ২০ হাজার ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ৪৯ হাজার ৬০০ টাকা এবং সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডে ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৪৮ হাজার ৪০০ টাকা বেতন হবে।
কেন এই পে-স্কেল বাস্তবায়নে সময় লাগছে?
মূল্যস্ফীতি, বাজেটের ওপর চাপ কমানো এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার এই নবম পে-স্কেল দুই বছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী রয়েছেন। নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সর্বশেষ সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭শে জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। এই বছরের ২১শে জানুয়ারি ওই কমিশন সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে।
স্বাধীন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় সরকারি কর্মচারীরা যেন আরও উৎসাহিত হয়ে কাজ করতে পারেন, সেই লক্ষ্যে এই নবম পে-স্কেল একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক মুক্তির পথে এ এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ছবি: বিবিসি