পাকিস্তান-কুয়েত প্রতিরক্ষা চুক্তি: 'ইসলামীয় নেটো'র সম্প্রসারণে নতুন মোড়, বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের শেখায়, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সার্বভৌমত্বের কোনো বিকল্প নেই। আজ পশ্চিম এশিয়ায় সেই সার্বভৌমত্বের সমীকরণ বদলে দিতে নতুন এক সামরিক জোটের উত্থান ঘটছে। পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের পর এবার কুয়েতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে ইসলামাবাদ। 'ইসলামীয় নেটো' নামে পরিচিত এই জোটের সম্প্রসারণে এটি কি নতুন মোড়? আর এই জোটে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?
কুয়েতের সঙ্গে পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি কী বলছে?
চলতি বছরের ২৭ অগস্ট ইসলামাবাদে 'যৌথ প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা চুক্তি' সই করেন কুয়েতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ আলি আবুদুল্লাহ আল-সাবাহ এবং পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ। দুই দেশের বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা, যৌথ প্রশিক্ষণ এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এই সমঝোতা তৈরি হয়েছে। কুয়েতের দাবি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার কথা মাথায় রেখে তারা এই চুক্তি করেছে।
'মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট' কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
গত বছর সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি করে পাকিস্তান। এর পরেই তুরস্ককে দলে টানে ইসলামাবাদ। ফলস্বরূপ, এ বছরের ৭ অগস্ট গড়ে ওঠে ত্রিশক্তি জোট 'মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট'। এই চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের কোনও একটিতে সশস্ত্র আক্রমণ হলে, সেটিকে বাকিদের উপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। পবিত্র মক্কায় হওয়া এই সামরিক সমঝোতাকে হালকাভাবে নিচ্ছেন না কূটনীতিক বা সামরিক বিশ্লেষকদের কেউই।
বাংলাদেশ কি 'ইসলামীয় নেটো'তে যোগ দিতে আগ্রহী?
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় সম্পদ। ১৯৭১ সালে আমরা নিজেদের রক্ত দিয়ে এই দেশ অর্জন করেছি। তাই কোনো সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার আগে আমাদের জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। সূত্রের খবর, 'ইসলামীয় নেটো'তে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী বাংলাদেশ। তবে মিশর, কাতার, সিরিয়া ও ইরানকেও এই জোটে যুক্ত করতে চাইছে পাকিস্তান। কিন্তু সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলির নিজেদের মধ্যে নানা মতপার্থক্য থাকায় ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি এখনই বলা কঠিন।
আমেরিকার 'ঘরের ছেলে' কুয়েত কেন পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে?
১৯৯১ সালে ইরাকের কাছ থেকে কুয়েতকে মুক্ত করেছিল আমেরিকা। এর পর থেকে কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। কিন্তু দশকের পর দশক ধরে সৌদি আরব, জর্ডন বা কুয়েতের মতো দেশগুলি পাকিস্তানি সামরিক সাহায্যের সুবিধা নিয়েছে। নতুন এই চুক্তির মাধ্যমে সেই সম্পর্কই আরও মজবুত করতে চাইছে কুয়েত।
ভারতের জন্য এই জোট কতটা চাপের?
পাকিস্তানের পশ্চিম প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের জন্য এই জোটের সম্প্রসারণ নিঃসন্দেহে চিন্তার বিষয়। উপসাগরীয় এলাকায় পাকিস্তানের প্রভাব বাড়লে ভারতের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এই জোটের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং গোপনীয়তার কারণে এর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি একটি শিক্ষণীয় মুহূর্ত। আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার রক্ষায় সতর্ক থাকতে হবে। কোনো পরাশক্তির চাপে বা লোভে আমাদের জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া চলবে না। ১৯৭১ সালের চেতনাই আমাদের পথ দেখাক।