প্যাকেটজাত খাবারে লাল সতর্কবার্তা: ভোক্তার অধিকার নাকি নতুন চ্যালেঞ্জ?
চিপস, কোল্ড ড্রিংকস বা প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্যাকেটে এবার লাল ষড়ভুজ সতর্কবার্তা বাধ্যতামূলক করার পথে এগোচ্ছে ভারতের খাদ্য সুরক্ষা সংস্থা FSSAI। সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া হলফনামায় এই সিদ্ধান্তের কথা স্বীকার করা হয়েছে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেমন আমাদের শেখায় নিজের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হতে, তেমনি খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নেও ভোক্তাদের সচেতন হওয়া জরুরি।
কী বলছে FSSAI-এর নতুন নির্দেশিকা?
ভারতের শীর্ষ খাদ্য নিয়ামক সংস্থা FSSAI সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছে, প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্যাকেটের সামনের দিকে লাল ষড়ভুজাকার চিহ্ন বসানো হবে। এই চিহ্ন দেখে ক্রেতারা বুঝতে পারবেন পণ্যটিতে অতিরিক্ত চর্বি, চিনি বা লবণ রয়েছে। দুটি ধাপে এই নিয়ম কার্যকর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রথম ধাপে ফ্যাট, চিনি বা লবণের মধ্যে অন্তত দুটি উপাদান ক্ষতিকর মাত্রায় থাকলে সতর্কবার্তা বসবে। মিষ্টিজাতীয় পানীয়ের জন্য থাকবে আলাদা বার্তা। দ্বিতীয় ধাপে নিয়ম আরও কঠোর হবে। তখন যেকোনো একটি উপাদান নির্ধারিত মাত্রার বেশি থাকলেই লাল লেবেল বাধ্যতামূলক হবে। তবে দুধ, ঘি, ভোজ্য তেল, লবণ, চিনি, গুড় ও মধুর মতো প্রাকৃতিকভাবে ফ্যাট বা চিনি সমৃদ্ধ পণ্য এই নিয়মের বাইরে থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা নীতিগতভাবে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও কিছু উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নিউট্রিশন অ্যাডভোকেসি ইন পাবলিক ইন্টারেস্ট-এর আহ্বায়ক ডা. অরুণ গুপ্ত বলেন, আইন মেনে নিলেও নানা শর্ত চাপিয়ে একে কিছুটা কার্যহীন করা হয়েছে। প্রথম ধাপে দুটি ক্ষতিকর উপাদান থাকলে তবেই লাল দাগ পড়বে। ফলে অনেক ক্ষতিকর খাবার ছাড় পেয়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্বিতীয় ধাপ কবে থেকে কার্যকর হবে তার স্পষ্ট সময়সীমা নেই। সতর্কবার্তাটি ইংরেজির পাশাপাশি হিন্দিতেও হওয়া উচিত ছিল। প্রস্তাবিত ফন্ট সাইজও বেশ ছোট। শুধু যুক্ত করা চিনি বা ফ্যাটের ভিত্তিতে লেবেল তৈরি হচ্ছে, যা পরিমাপ করা কঠিন।
বিশ্বজুড়ে এই পদক্ষেপ কতটা সফল?
বিশ্বের প্রায় ৪৪টি দেশে প্যাকেটের সামনের দিকে লেবেলিং ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি দেশে এটি বাধ্যতামূলক। চিলি, পেরু, ইসরায়েল, মেক্সিকো, কানাডার মতো অন্তত ১০টি দেশ ওয়ার্নিং লেবেল ব্যবহার করে। চিলিতে এই লেবেল চালুর পর মিষ্টি পানীয় বিক্রি প্রায় ২৪ শতাংশ কমে গিয়েছিল।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই খবর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশেও প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। ১৯৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রাম যেমন আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সচেতন করেছে, তেমনি খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নেও আমাদের নিজেদের অবস্থান নিতে হবে। বিদেশি প্রভাব ও ভোক্তা সংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকে রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের উচিত ভারতের এই উদ্যোগ থেকে শিক্ষা নেওয়া। আমাদের দেশের মানুষের স্বাস্থ্য ও খাদ্যাভ্যাস রক্ষায় প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্যাকেটে সতর্কবার্তা বাধ্যতামূলক করা জরুরি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের শেখায়, নিজের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় আমাদের সবসময় সচেষ্ট থাকতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নেও সেই একই দৃঢ়তা প্রয়োজন।