নেপালের হড়পা বান: প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, হিমালয়ের ক্রমবর্ধমান সংকটের ইঙ্গিত
নেপালের ভোটেকোশী নদীতে ভয়াবহ হড়পা বানে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৭ জনে। এখনও নিখোঁজ বহু মানুষ, যাদের মধ্যে রয়েছেন ১৪১ জন ভারতীয় পর্যটকও। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, এই বিপর্যয়ের মূল কারণ ভূমিকম্প নয়, বরং হিমবাহ ধস।
বুধবার রাতে ইউএসজিএস জানায়, প্রাথমিকভাবে যে ঘটনাকে ৪.৪ মাত্রার ভূকম্পন বলে মনে করা হচ্ছিল, তা আদতে হিমবাহ ধস। হিমবাহের সঙ্গে কাদামাটির বিশাল তাল নদীর অববাহিকায় নেমে এসেই এই বিপর্যয় ঘটে। নেপালের সংবাদমাধ্যম 'কাঠমান্ডু পোস্ট' জানিয়েছে, এই বিপর্যয়ে এখনও পর্যন্ত অন্তত ১৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে ২৯১ বিদেশি-সহ অন্তত ৩৮৪ জন পর্যটকের কোনো খোঁজ মেলেনি। তাঁদের মধ্যে ১৪১ জন ভারতীয়, যাঁরা কৈলাস-মানস সরোবর দর্শনে যাচ্ছিলেন।
কীভাবে ঘটল এই বিপর্যয়?
কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রাসুয়া জেলা দিয়ে বয়ে গেছে ভোটেকোশী নদী। বুধবার সকাল সাড়ে ৮টার কিছু পরে আচমকা নদীর জলস্তর বৃদ্ধি পায়। নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খনাল সংসদে জানান, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে একটি ভূমিকম্প হয়, তার পর একটি তুষারধস ঘটে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই নেমে আসে হড়পা বান।
তবে ইউএসজিএস জানাচ্ছে, ওই সময়ে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে কোনো ভূমিকম্পই হয়নি। ভূবিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, তুষারধসের জেরে পাথর ও বরফের স্তূপে নদীর গতিপথ অবরুদ্ধ হয়ে যায়। জমে যাওয়া জলের চাপে হঠাৎ সেই অবরোধ ভেঙে যায়, ফলে সৃষ্টি হয় হড়পা বান।
ক্ষয়ক্ষতি ও উদ্ধার অভিযান
হড়পা বানে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তিব্বত সংলগ্ন রাসুয়া জেলা। তুলনায় কম হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নুয়াকোট এবং ধারিং জেলাও। নেপাল সীমান্ত লাগোয়া তিব্বতের স্থলবন্দর জিরঙেও প্রাণহানির খবর এসেছে। রাসুয়ার জেলাশাসক নগেন্দ্র পারিয়ার রয়টার্সকে জানান, বেশ কিছু গ্রামীণ এলাকা ভেসে গেছে। তিনি বলেন,
প্রচুর সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি এবং ব্যাপক হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে।
নেপালের সংবাদমাধ্যমের একাংশের আশঙ্কা, আগামী ২৪ ঘণ্টায় মৃত ও নিখোঁজের তালিকা আরও দীর্ঘ হতে পারে। উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে, তবে নিখোঁজদের অধিকাংশেরই খোঁজ মেলেনি।
হিমালয়ের হিমবাহ: এক নীরব সংকট
এই বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এল হিমালয়ের হিমবাহগুলির ক্রমবর্ধমান সংকট। ২০১৯ সালে 'সায়েন্স অ্যাডভান্সেস' পত্রিকায় প্রকাশিত এক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয়ের হিমবাহগুলি থেকে প্রতি বছর দেড় ফুটেরও বেশি উচ্চতার বরফ গলে যাচ্ছে। ১৯৭৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত যে গতিতে বরফ গলছিল, ২০০০ সালের পর থেকে তা দ্বিগুণ গতিতে গলছে।
এই গবেষণায় ভারত, চিন, নেপাল, ভুটান এবং চিন-অধিকৃত তিব্বতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ৪০ বছর ধরে উপগ্রহের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এই তথ্য উঠে এসেছে। তুষারধসের কারণে হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে হিমবাহ ভেঙে হড়পা বানের বিপদসঙ্কেতও দেওয়া হয়েছিল সেই গবেষণায়।
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য হুমকি
এই বিপর্যয়ের প্রভাব শুধু নেপালেই সীমাবদ্ধ নয়। তিব্বতের মানস সরোবরের অদূরে আনসি হিমবাহ থেকে উৎপন্ন ইয়ারলুং সাংপো নদীর নিম্ন অববাহিকায় চিনের বৃহত্তম বাঁধ নির্মাণকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এই ইয়ারলুং সাংপো তিব্বত থেকে ভারতে প্রবেশের পরে ব্রহ্মপুত্র নাম নেয়। আবার ব্রহ্মপুত্র বাংলাদেশে প্রবেশের পরে নাম নিয়েছে যমুনা।
হড়পা বানের জেরে চিনের বাঁধে বিপর্যয় ঘটলে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে ভারত এবং বাংলাদেশেও। আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় সক্ষমতা গড়ে তোলাও এখন সময়ের দাবি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আমরা যেমন স্বাধীনতার জন্য লড়েছিলাম, তেমনি আজ প্রকৃতির এই ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায়ও আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।
নেপালের এই বিপর্যয় আমাদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট এই সংকট মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। আমাদের নদী ও পরিবেশ রক্ষা করা মানে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করা, তা আমরা কখনো ভুলতে পারি না।