পাহাড়ের প্রকৃত মূল্য: খনিজ নাকি জীবন, বিশ্বাস আর সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
ওড়িশার সিজিমালি পাহাড়ে বক্সাইট খনির প্রস্তাবকে ঘিরে আবারও সংঘাতের মুখে রাষ্ট্র, বহুজাতিক সংস্থা এবং স্থানীয় জনজাতি গোষ্ঠী। একটি পাহাড়ের মূল্য কী দিয়ে নির্ধারিত হওয়া উচিত, তার ভেতরের আকরিক দিয়ে, নাকি তাকে ঘিরে থাকা জল, বন, জীবিকা, স্মৃতি আর বিশ্বাস দিয়ে? এই প্রশ্নই আজ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার গভীরতম পাঠকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ১৯৭১-এ আমরা যে স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য লড়েছিলাম, তার মূলে ছিল আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ভূমির উপর পূর্ণ অধিকার। সিজিমালির সেই একই প্রশ্ন, নিজের সম্পদের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকবে।
নিয়মগিরির ঐতিহাসিক লড়াই থেকে সিজিমালির বর্তমান সংকট
ওড়িশার রায়গড়া ও কালাহান্ডি জেলার সিজিমালি পাহাড়ে প্রস্তাবিত বক্সাইট খনির বিরুদ্ধে আবারও সরব স্থানীয় জনজাতি গোষ্ঠী। ২০২৩ সালে ওড়িশা সরকার এই প্রকল্পের জন্য পঞ্চাশ বছরের খনি ইজারা দিয়েছে, যা নিয়ে ইতিমধ্যেই উঠেছে পরিবেশগত প্রভাব, জমির অধিকার এবং স্থানীয়দের সম্মতির প্রশ্ন। এই বিতর্কের একটি ঐতিহাসিক নজির রয়েছে নিয়মগিরিতে। ডোঙ্গরিয়া কন্ধ জনগোষ্ঠীর কাছে নিয়মগিরি শুধু একটি পাহাড় নয়, এটি তাদের দেবতা নিয়ম রাজার আবাসস্থল। ২০০৩ সালে বহুজাতিক খনি সংস্থার সাথে ওড়িশা সরকারের সমঝোতা স্মারকের পর ২০০৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি ভারতের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়: স্থানীয়দের মতামতই চূড়ান্ত
২০১৩ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে ঘোষণা করে যে, নিয়মগিরির উপর ডোঙ্গরিয়া কন্ধ ও অন্যান্য বনবাসী জনগোষ্ঠীর ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামষ্টিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে কি না তা নির্ধারণের অধিকার স্থানীয় গ্রামসভাগুলিরই। এই রায় পাহাড়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে স্থানীয় জনজাতি গোষ্ঠীর মতামতকে কেবল আনুষ্ঠানিক পরামর্শ হিসাবে নয়, বরং অধিকার নির্ধারণের একটি মৌলিক ধাপ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথেই সঙ্গতিপূর্ণ, যেখানে প্রতিটি মানুষের নিজের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার সর্বোচ্চ।
বক্সাইট শুধু আকরিক নয়, জল ও জীবিকার নিয়ন্ত্রক
বক্সাইট কেবল অ্যালুমিনিয়াম আহরণের খনিজ নয়; এটি পার্শ্ববর্তী এলাকার জল ব্যবস্থাপনারও নিয়ন্ত্রক। পাহাড়চূড়ার ল্যাটেরাইট-বক্সাইট স্তর বর্ষার জল শোষণ করে, যা ঢাল বেয়ে নেমে উপত্যকায় জলধারা তৈরি করে। এই জলধারার উপর নির্ভরশীল ডোঙ্গরিয়া কন্ধদের পানীয় জল, কৃষি ও দৈনন্দিন জীবন। জাতীয় পরিবেশ ও বন মন্ত্রকের গঠিত এন সি সাক্সেনা কমিটির ২০১০ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রস্তাবিত খনি এলাকার উপরের বক্সাইট স্তর বহু স্থায়ী জলপ্রপাতের উৎস এবং বংশধারা নদীর জলযোগের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। কন্ধরা মূলত উদ্যানচাষ-নির্ভর জনগোষ্ঠী। আনারস, কমলা, কলা, আম, কাঁঠাল, হলুদ ও আদার মতো ফল ও মশলার পাশাপাশি তারা বনজ সম্পদ সংগ্রহ করে থাকেন। প্রতিবেদনে প্রায় বিশ প্রজাতির অর্কিডের উল্লেখ আছে, যা নানা রোগের চিকিৎসায় ভেষজ ওষুধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। স্থানীয়ভাবে পরিচিত আওনলাভাটা অঞ্চলে প্রচুর আমলকী হয়, যা মধু ও ভোজ্য মাশরুমের মতো তাদের পুষ্টি ও আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
বিকল্প দৃষ্টান্ত: অস্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিলের খনি পুনর্বাসন মডেল
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় অ্যালকোয়া-র বক্সাইট খনিগুলিতে খননের আগেই আগামী দিনের ভূমি ব্যবহার, পানীয় জলের উৎস, জীববৈচিত্র এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশাকে পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। খনি-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের জন্য নির্দিষ্ট 'কমপ্লিশন ক্রাইটেরিয়া' নির্ধারণ করা হয়েছে, যার লক্ষ্য কেবল গাছ লাগানো নয়, বরং স্থানীয় বনভূমির গঠন, আবাসস্থল, জীববৈচিত্র ও বাস্তুতান্ত্রিক কার্যকারিতার পুনর্গঠন। এই মানদণ্ড পূরণ না হওয়া পর্যন্ত খনি এলাকা সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয় না। অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, সফল খনি পুনর্বাসনের শর্ত শুধু পরিবেশগত নয়। স্থানীয় জনজাতি গোষ্ঠীর 'ফ্রি, প্রায়োর অ্যান্ড ইনফর্মড কনসেন্ট', তাদের বনজ জীবিকা, ঔষধি উদ্ভিজ্জ, ঐতিহ্যগত সম্পদ সংগ্রহের অধিকারও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। একইভাবে, ব্রাজিলের বক্সাইট খনি পুনরুদ্ধার কর্মসূচিগুলো প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনার উপর জোর দিয়েছে।
উন্নয়নের সংজ্ঞা কী হবে, তা নির্ধারণের দায়িত্ব কার?
ভারতের মতো দ্রুত উন্নয়নমুখী দেশে খনিজ আহরণ নিশ্চয়ই জরুরি। তবে, উন্নয়নের প্রশ্নটি যদি কেবল 'কত টন বক্সাইট উত্তোলন করা সম্ভব' এই হিসাবে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সংঘাত আসবেই। জানতে হবে কোন জলধারা, কোন বন, কোন জীবিকা এবং কোন সংস্কৃতি সেই খনিজের সাথে দৃশ্যমান কিংবা অদৃশ্যভাবে জড়িয়ে আছে। হয়তো খনিজ আহরণে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তিগত নয়, বরং বিজ্ঞানের পাশাপাশি স্থানীয়দের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার বিশ্লেষণ ও সম্মিলন। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে, নিজের সম্পদ ও সংস্কৃতির উপর সার্বভৌম অধিকার কোনো আপসের বিষয় নয়। সিজিমালির পাহাড় আজ সেই শিক্ষাকেই নতুন প্রসঙ্গে সামনে এনেছে। প্রকৃত উন্নয়ন সেই পথেই সম্ভব, যেখানে প্রযুক্তি ও অর্থনীতির পাশাপাশি মানুষের জীবন, বিশ্বাস ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা পায়।
পাহাড়ের দাম কত: একটি চিরন্তন প্রশ্ন
একটি পাহাড়ের দাম কত? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের দেখতে হবে তার ভেতরের আকরিক, তার গায়ের জলধারা, তার বুকের বন, আর তার ছায়ায় বেড়ে ওঠা মানুষের জীবন ও বিশ্বাসকে। নিয়মগিরির লড়াই এবং সিজিমালির বর্তমান সংকট আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃত স্বাধীনতা মানে নিজের সম্পদের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ, নিজের সংস্কৃতির প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের পথ দেখাক, যেখানে প্রতিটি পাহাড়, প্রতিটি নদী, প্রতিটি ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা থাকবে অক্ষুণ্ণ।