কেঁচো সারেই বদলে গেল কৃষকের ভাগ্য, মুক্তির পথ দেখাল জৈব চাষ
রংপুরের তারাগঞ্জের কৃষক মাইদুল ইসলাম আজ আর 'কেঁচো মাইদুল' নামে পরিচিত। ২০২৩ সালে রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহারে তাঁর আমন ধানের খেত লালচে হয়ে গিয়েছিল। সেই সংকটই তাঁকে নতুন পথ দেখিয়েছে। আজ তিনি মাসে সাত থেকে আট টন কেঁচো সার উৎপাদন করেন, যা বিক্রি করে তাঁর মাসিক আয় প্রায় ৪০ হাজার টাকা। শুধু নিজে নন, তাঁর দেখানো পথে হেঁটে শেরমস্তসহ আশপাশের গ্রামের বহু কৃষক এখন রাসায়নিক সারমুক্ত চাষাবাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
রাসায়নিক সারের জাল থেকে মুক্তির সন্ধান
মাইদুলের বাবা জয়নাল আবেদীন ছিলেন এলাকার বড় কৃষক। সাত একর জমি ছিল তাঁর। ছোটবেলা থেকে কৃষিকাজের প্রতি আগ্রহ ছিল মাইদুলের। কিন্তু ২০২৩ সালে নিজের তিন একর আমন ধানের খেতে সমস্যা দেখা দিলে তাঁর চিন্তার জগৎ বদলে যায়। ধানগাছ লালচে হয়ে যাওয়ায় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম তাঁকে জানান, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণেই এমনটি হয়েছে। দীর্ঘদিন এই সার ব্যবহার করলে মাটির উর্বরতা শক্তি কমে যায়।
এই সংকট থেকেই মুক্তির পথ খুঁজতে গিয়ে মাইদুল জানতে পারেন কেঁচো সার বা কেঁচো কম্পোস্টের কথা। কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি বাড়ির উঠানে কেঁচো সার তৈরি শুরু করেন। নিজের জমিতে ব্যবহার করে ভালো ফলন পাওয়ার পর তাঁর আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। এখন সেটিই তাঁর আয়ের অন্যতম উৎস।
কীভাবে তৈরি হয় কেঁচো সার?
প্রশিক্ষণ শেষে মাইদুল তাঁর বাড়ির উঠানে টিনের চালা তুলে ২০টি সিমেন্টের রিং বসান। নিজের গরুর খামার থেকে সংগ্রহ করা গোবর রিংগুলোতে দেন। প্রশিক্ষণ থেকে পাওয়া কেঁচো ছেড়ে দেন সেখানে। প্রায় এক মাস পর ২০টি রিং থেকে পাওয়া যায় প্রায় এক হাজার কেজি কেঁচো সার। একই সঙ্গে বাড়তে থাকে কেঁচোর সংখ্যাও।
সব খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজি কেঁচো সার উৎপাদনে মাইদুলের খরচ পড়ে গড়ে ৬ টাকা। তিনি সার বিক্রি করেন ১৩ টাকা কেজি দরে। সার তৈরি হতে সময় লাগে ৩০ থেকে ৩৫ দিন। আরও টুকটাক খরচ বাদ দিয়ে কেঁচো সার বিক্রি করে মাসে তাঁর ৪০ হাজার টাকার মতো আয় হয়।
কেঁচোতেই খুলেছে ভাগ্যের দুয়ার
ফাজিলপুর গ্রামের কৃষক মজিবুর রহমানের (৪২) গল্প একটু অন্য রকম। একসময় রাসায়নিক সার কিনতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। ২০২৪ সালে মাইদুলের কাছ থেকে কেঁচো নিয়ে দুটি সিমেন্টের রিংয়ে কেঁচো সার তৈরি শুরু করেন। এখন তাঁর রিংয়ের সংখ্যা পাঁচ।
মজিবুরের ভাষায়, 'কেঁচো হামার ভাগ্য খুলি দিছে। এ গ্রামকে হামরা রাসায়নিক সারমুক্ত করমু।'
মজিবুর নিজের উৎপাদিত কেঁচো সার তাঁর দুই বিঘা জমিতে ব্যবহার করেন। রাসায়নিক সার ব্যবহার কমিয়ে নিজের তৈরি জৈব সার ব্যবহার করায় সার কেনার প্রায় ২০ হাজার টাকা সাশ্রয় হচ্ছে বলে জানান তিনি।
পাতিলভাঙ্গা গ্রামের রশিদা বেগমের (৩৬) সংসারেও স্বস্তি এনেছে কেঁচো সার। স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই সন্তানকে নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো তাঁকে। তিন বিঘা জমির ফসলের ওপর নির্ভর করেই চলত সংসার। প্রায় দেড় বছর আগে মাইদুলের কাছ থেকে কেঁচো নিয়ে বাড়িতে কেঁচো কম্পোস্ট তৈরি শুরু করেন তিনি। এখন নিজেদের জমিতে সেই সার ব্যবহার করেন। পাশাপাশি কেঁচো ও কেঁচো সার বিক্রি করে বছরে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় করছেন।
মাটির যত্নে কেঁচো সারের ভূমিকা
দর্জিপাড়া গ্রামের কৃষক একরামুল হক (৩৯) এক একর জমিতে সবজি চাষে আগে যে পরিমাণ রাসায়নিক সার ব্যবহার করতেন, কেঁচো সার ব্যবহারের পর তা কমেছে। তাঁর অভিজ্ঞতায়, জৈব সার ব্যবহারে জমির উর্বরতা বাড়ছে এবং ফসলে পোকামাকড়ের আক্রমণও তুলনামূলক কম হচ্ছে।
তারাগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীবা রানী রায় জানান, কেঁচো সার মাটির উর্বরতা বাড়াতে সহায়তা করে। এতে মাটির পানি ধারণক্ষমতা বাড়ে এবং মাটির গঠন উন্নত হয়। এ সার ব্যবহারে ফসলের উৎপাদন ও গুণগত মান ভালো হতে পারে। তিনি বলেন, কৃষকদের কেঁচো সার তৈরিতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। মাইদুল ইসলামের মতো অনেকেই এ সার তৈরি ও বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন।
১৯৭১-এর চেতনায় কৃষির স্বনির্ভরতা
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের শিখিয়েছে আত্মনির্ভরতার কথা। ১৯৭১ সালে আমরা যেমন অস্ত্রের মাধ্যমে রাজনৈতিক মুক্তি এনেছিলাম, তেমনি আজ কৃষিতে রাসায়নিক সারের নির্ভরতা কাটিয়ে জৈব চাষের মাধ্যমে অর্থনৈতিক মুক্তির পথ খুঁজছেন মাইদুলের মতো কৃষকেরা। বিদেশি সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় পদ্ধতিতে উৎপাদিত জৈব সারই হতে পারে আমাদের কৃষির ভবিষ্যৎ। মাইদুলের এই উদ্যোগ শুধু একটি পরিবারের ভাগ্য বদলায়নি, গোটা অঞ্চলের কৃষকদের জন্য হয়ে উঠেছে নতুন আশার আলো।
কেঁচো সার নিয়ে প্রায়শই জিজ্ঞাসা
কেঁচো সার তৈরি করতে কত দিন লাগে?
কেঁচো সার তৈরি হতে সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ দিন সময় লাগে। গোবর ও কেঁচো ব্যবহার করে এই সার তৈরি করা হয়।
কেঁচো সার কেজি প্রতি কত দামে বিক্রি হয়?
মাইদুল ইসলাম প্রতি কেজি কেঁচো সার ১৩ টাকা দরে বিক্রি করেন। উৎপাদনে তাঁর খরচ পড়ে গড়ে ৬ টাকা।
কেঁচো সার ব্যবহারে কী কী উপকার হয়?
কেঁচো সার মাটির উর্বরতা বাড়ায়, পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং মাটির গঠন উন্নত করে। এতে ফসলের উৎপাদন ও গুণগত মান ভালো হয় এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ কমে।