জাপানের মাঠ থেকে বাংলাদেশের মাটি: শুকির লাল-সবুজ অভিযাত্রা
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জাপানি তরুণ শুকি ইতোফুসা এবার পেশাদার ফুটবলের নতুন অধ্যায়ে পা রাখছেন। ২২ বছর বয়সী এই তরুণ চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন বাংলাদেশের ক্লাব ফর্টিস এফসিতে। তাঁর বাবা আতাউর রহমান নারায়ণগঞ্জের সন্তান, আর মা শিজু ইতোফুসা জাপানি। জাপানে জন্ম ও বেড়ে ওঠা শুকির জন্য এটি প্রথম শীর্ষ লিগে খেলার সুযোগ।
ভাষার বাধা পেরিয়ে: প্রযুক্তির স্পর্শ
চার দিন আগে ঢাকায় এসেছেন শুকি। রাজধানীর বেরাইদে ফর্টিস ক্লাব ভবনে প্রথম সাক্ষাতে ভাষার বাধা ছিল প্রকট। বাংলা তো বলতে পারেনই না, ইংরেজিও খুবই সামান্য। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যম চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে সেই বাধা কাটিয়ে উঠেছেন। বাংলা কথাগুলো জাপানিজে রূপান্তরিত হচ্ছে, আর জাপানি উত্তর ফিরে আসছে বাংলায়।
শুকির নামের অর্থ ও ফুটবলের শুরু
জাপানি শব্দ 'শুকি'র অর্থ আনন্দ বা সুখের প্রতীক। নিজের চুল রাঙিয়েছেন রুপালি-সোনালি রঙে। ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি উচ্চতার এই তরুণকে দেখে বোঝার উপায় নেই, বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র আছে। আট বছর বয়সে এক বছর ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় থেকে জাপানি স্কুলে পড়েছেন। পরে টোকিওর ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্রীড়াবিজ্ঞান ও মানবদেহ নিয়ে পড়াশোনা করেছেন।
ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার শুরু ২০১০ সালে টিভিতে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ দেখে। জাপানে বেসবল সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হলেও শুকির স্বপ্নজুড়ে ছিল ফুটবল। জাপান এভিয়েশন হাইস্কুল থেকে উঠে আসা শুকি জাপানের ৫ম স্তরের ক্লাব টোকিও ২৩ এফসি ও ব্রিউ সাগার হয়ে খেলেছেন। জাপানের ঐতিহ্যবাহী এম্পেররস কাপে গোল করা তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অর্জন। চলতি বছরের শুরুতে লাওসের শীর্ষ লিগের দল সাভান্নাখেত জিলোস এফসিতে নাম লেখালেও ম্যাচ খেলা হয়নি। দুই উইংয়েই খেলতে পারেন। গতি, ড্রিবলিং ও নিখুঁত ক্রসিং তাঁর শক্তির জায়গা।
বাংলাদেশের সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া
ফর্টিসে আসার পর অনুশীলনের পাশাপাশি সবকিছুর সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিচ্ছেন শুকি। স্থানীয় খাবারের মধ্যে ফুচকা তাঁর বেশ পছন্দ। অবসর সময়ে টেবিল টেনিস খেলতে আর সাওনায় সময় কাটাতে ভালোবাসেন। ফুটবল-দর্শনে ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমার প্রিয় খেলোয়াড় হলেও জাপানি ফুটবলার ইউতো নাগাতোমো ও শিনজি কাগাওয়াও পছন্দের তালিকায়।
পছন্দের তালিকায় নিজের শিকড়ও জড়িয়ে। জাপান না বাংলাদেশ, এমন প্রশ্নের জটিল সমীকরণে না গিয়ে হেসে সহজভাবে বললেন, জাপান মানে শৃঙ্খলা ও স্থায়িত্ব, আর বাংলাদেশ মানে মানুষের মধ্যে আন্তরিক সম্পর্ক। দুটি দেশই তাঁর কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখন বাংলাদেশকে ঘিরেই তাঁর যত পরিকল্পনা।
লাল-সবুজের জার্সিতে স্বপ্ন
পরিকল্পনার বড় অংশজুড়ে এখন লাল-সবুজের জার্সি। বাফুফের সঙ্গে বাবার যোগাযোগ হয়েছে। শুকির জন্মনিবন্ধন হয়ে গেছে, যা দিয়ে তিনি বাংলাদেশি হিসেবেই ফর্টিসে খেলবেন। জাতীয় দলে খেলার বড় শর্ত বাংলাদেশের পাসপোর্টও হয়ে যাচ্ছে কয়েক দিনের মধ্যে। নিজের স্বপ্নের কথা জানিয়ে শুকি বলেন, 'বাংলাদেশ কোচ টমাস ডুলি আমাকে বলেছেন, তিনি আমার খেলা দেখতে চান এবং ভালো পারফর্ম করলে জাতীয় দলে খেলার সুযোগ আসবে। আমি সেই সুযোগ লুফে নিতে চাই।'
শুকি তা পারবেন বলেই বিশ্বাস ফর্টিস এফসির ম্যানেজার ও সাবেক ফুটবলার রাশেদুল ইসলামের। তিনি বলেন, 'ভিডিওতে দেখে তাকে আমাদের পছন্দ হয়েছে। খেলার প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা আছে ছেলেটির। সব ঠিক থাকলে সে অনেক দূর যেতে পারে।'
১৯৭১-এর চেতনা ও নতুন প্রজন্মের স্বাধীনতা সংগ্রাম
শুকির এই বাংলাদেশি যোগসূত্রের গল্পের সুতা বাঁধা রয়েছে ১৯৮৮ সালে। সে বছর প্রথমবার জাপানে ঘুরতে গিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের আতাউর রহমান। পরে সেখানে স্থায়ী হন এবং ২০০০ সালে বিয়ে করেন শিজু ইতোফুসাকে। তাঁর তিন মেয়ে আর এক ছেলের মধ্যে শুকি তৃতীয় সন্তান। আতাউর রহমান বর্তমানে জাপানে ব্যবসা করছেন। হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে জাপান থেকে ভেসে এল ছেলেকে নিয়ে উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠ, 'সব মা-বাবাই চান, সন্তান জীবনে ভালো কিছু করুক, আমিও চাই শুকি বাংলাদেশে ভালো খেলুক।'
মাঠে জাপানি শৃঙ্খলা আর হৃদয়ে বাংলাদেশি আবেগ, এই দুইয়ের শক্তিতেই এখন শুকির নিজেকে প্রমাণের পালা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহন করে, আজকের বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করছে। শুকির মতো তরুণরা সেই পথেই এগিয়ে যাচ্ছে, লাল-সবুজের পতাকাকে সম্মান জানাতে।
শুকি কি জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পাবেন?
বাংলাদেশ কোচ টমাস ডুলি শুকির খেলা দেখতে চান। ভালো পারফর্ম করলে জাতীয় দলে খেলার সুযোগ আসবে। শুকি সেই সুযোগ লুফে নিতে প্রস্তুত।
শুকির খেলার ধরন কেমন?
শুকি দুই উইংয়েই খেলতে পারেন। গতি, ড্রিবলিং ও নিখুঁত ক্রসিং তাঁর শক্তির জায়গা। জাপানের এম্পেররস কাপে গোল করা তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অর্জন।