স্বাধীনতার চেতনায় গড়ে ওঠা শিরোইলের বক্সিংপাড়া: রিং ছাড়াই রিংয়ের যোদ্ধা তৈরি
রাজশাহীর শিরোইল কলোনি আজ দেশের বক্সিংয়ের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বীরত্বের উত্তরাধিকার বহন করে এই পাড়া থেকে উঠে এসেছেন অসংখ্য বক্সার, যাঁরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের পতাকা উঁচু করে ধরেছেন। অথচ এই সাফল্যের গল্পের পেছনে রয়েছে এক বিস্ময়কর সত্য: শিরোইলে আজ পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি একটি স্থায়ী বক্সিং রিং।
এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতি: শিরোইলের চার যোদ্ধা
পল্টনের মোহাম্মদ আলী বক্সিং স্টেডিয়ামে চলছে ঘামঝরানো লড়াই। এক পাশে সেলিম হোসেন ও উৎসব আহমেদ; অন্য পাশে মোহাম্মদ বেলাল ও আবু তালহা। গ্লাভসে গ্লাভসে আঘাত, শরীরের চাপ আর হাঁপিয়ে ওঠা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে কোনো টুর্নামেন্ট চলছে। অথচ এটি এশিয়ান গেমসের আগে নিজেদের ঝালিয়ে নেওয়ার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
এই চার বক্সারের মধ্যে সেলিম ও উৎসব যাচ্ছেন ১৯ সেপ্টেম্বর জাপানের আইচি-নাগোয়ায় অনুষ্ঠেয় এশিয়ান গেমসে। অন্য দুজন বেলাল ও তালহা তাঁদের সেই যাত্রার 'অনুশীলন-অংশীদার'। এই চারজনের লড়াইয়ের শুরুটা রাজশাহীর শিরোইল কলোনিতে, যা এখন স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে পরিচিত 'বক্সিংপাড়া' নামে।
১৯৮৬ সালের গল্প: যে সাফল্য বদলে দেয় একটি পাড়ার ভাগ্য
একটি সাধারণ আবাসিক কলোনি কীভাবে আস্ত এক বক্সিংপাড়ায় রূপ নিল? এর পেছনের ইতিহাস প্রায় চার দশক আগের। সালটা ১৯৮৬। সিউল এশিয়ান গেমসের ৮১ কেজি ওজন শ্রেণিতে রিংয়ে নেমে ব্রোঞ্জপদক জিতেছিলেন রাজশাহীর মোশাররফ হোসেন। বাংলাদেশের বক্সিং ইতিহাসে ব্যক্তিগত ইভেন্টে সেটিই একমাত্র পদক হয়ে আছে।
মোশাররফের বাড়ি শিরোইলের ঠিক পাশেই তালাইমারীতে। পাশের পাড়ার সেই মানুষের সাফল্যের গল্প ছড়িয়ে পড়েছিল শিরোইলের ঘরে ঘরে। বড়দের মুখে সেই গল্প শুনে ছোটদের মনে এক অবিচল বিশ্বাসের জন্ম হয়েছিল: 'তিনি পারলে, আমরাও পারব।'
এই বিশ্বাসই যেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মতোই ছড়িয়ে পড়ে শিরোইলের প্রতিটি প্রান্তে। স্বাধীনতার পর যেভাবে বাঙালি নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছিল, ঠিক সেভাবেই শিরোইলের তরুণরা নিজেদের গড়ে তুলতে শুরু করে।
গলি থেকে জাতীয় দল: শিরোইলের বক্সিং বিপ্লব
এর পর থেকেই শিরোইলের গলিতে গলিতে বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট। একজন গ্লাভস হাতে নিলে তাঁকে দেখে আরেকজন উদ্বুদ্ধ হন। কেউ জায়গা পান বিকেএসপিতে, কেউ সার্ভিসেস দলে বা জাতীয় দলে। বর্তমানে শুধু এই শিরোইলেই ছোট-বড় মিলিয়ে পাঁচটি ক্লাব ও বক্সিং প্রশিক্ষণকেন্দ্র আছে।
দেশের বিভিন্ন সার্ভিসেস দল, বিকেএসপি এবং জাতীয় দলে খেলছেন এখানকার ৩০ জনের বেশি বক্সার। এর মধ্যে শুধু বাংলাদেশ আনসার বক্সিং দলেই আছেন শিরোইলের ১০ বক্সার। এই সংখ্যাগুলো প্রমাণ করে, প্রতিকূলতার মধ্যেও দৃঢ় প্রতিজ্ঞা থাকলে কীভাবে সাফল্য অর্জন করা যায়।
সেলিমের লড়াই: মায়ের বাধা থেকে এশিয়ান গেমসের কোয়ার্টার ফাইনাল
সেই শিরোইলেরই পরিচিত মুখ সেলিম। বক্সিংয়ে যাঁর শুরুর পথটা মোটেও সহজ ছিল না। এই খেলাকে স্রেফ মারামারি ভেবে প্রথমে খেলতে দিতে রাজি ছিলেন না তাঁর মা। তবে তত দিনে সেলিমের বক্সিং এমন পছন্দ হয়ে গেছে যে মারধর করেও তাঁকে আটকাতে পারেননি।
২০১৫ সালে জাতীয় ক্যাম্পে সুযোগ পাওয়ার পর ২০১৯ সাল থেকে নিয়মিত জাতীয় দলের হয়ে খেলছেন সেলিম। ২০২২ এশিয়ান গেমসেও তিনি কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত লড়াই করেছিলেন। সেই হারের হতাশাকে এবার পদকে রূপান্তর করতে চান। সেলিমের ভাষায়, 'গতবার পারিনি। অনেক দূর গিয়েও হেরে গেছি। এবার পদক নিয়েই ফিরতে চাই।'
উৎসবের অনুপ্রেরণা: মামার সাফল্যে বদলে যাওয়া জীবন
উৎসবের গল্পটা আবার অন্য রকম। ছোটবেলায় বক্সিং বেশ ভয় পেতেন। প্রথম পছন্দ ছিল ফুটবল। তবে ২০১০ সাফ গেমসে তাঁর মামা জুয়েল আহমেদের সোনা জয় পাল্টে দেয় দৃষ্টিভঙ্গি। মামার সাফল্য দেখে মনে হয়েছিল, বক্সিংয়েও বড় কিছু করা সম্ভব।
২০১৭ সালে জুনিয়র বক্সিং দিয়ে শুরু উৎসবের। এরপর গত বছরের এপ্রিলে ভুটানে চার জাতির আন্তর্জাতিক বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জেতেন। এবার উৎসব প্রথম যাচ্ছেন এশিয়ান গেমসে। আর প্রথমবারেই বড় স্বপ্ন তাঁর। উৎসবের প্রত্যয়, 'লক্ষ্য অবশ্যই পদক জেতা। জানি, এটা সহজ হবে না। তারপরও পদকের জন্য শেষ পর্যন্ত লড়ব।'
বৈপরীত্যের গল্প: সাফল্যের পরও নেই স্থায়ী রিং
অনেক ইতিবাচক গল্পের মাঝেও শিরোইল কলোনির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো: এত এত প্রতিভাবান বক্সার ও সাফল্যের ইতিহাস থাকার পরও এখানে আজ পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি একটি স্থায়ী বক্সিং রিং। চারটি দড়ি টানানো অস্থায়ী রিংয়েই ঘাম ঝরান নবাগত থেকে শুরু করে অভিজ্ঞরা।
অবশ্য সুযোগ-সুবিধার এমন অভাব সত্ত্বেও থামেনি সেখানকার বক্সারদের অনুশীলন। তবে এ নিয়ে সেলিমের অবশ্যই আক্ষেপ আছে। হাহাকারের মতো শোনায় তাঁর কথাটা, 'আমাদের পাড়া থেকে এত খেলোয়াড় বের হয়, অথচ এখনো একটা স্থায়ী রিং পেলাম না।'
চাওয়া আছে, আক্ষেপ আছে। তবে সেসব ছাপিয়ে শিরোইলের বক্সিং-পরম্পরা প্রমাণ করে দেয়, চোখে স্বপ্ন আর মনে প্রতিজ্ঞা থাকলে সব প্রতিকূলতাই জয় করা যায়। এই চেতনাই যেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনারই প্রতিচ্ছবি। ১৯৭১ সালে যেভাবে আমরা সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলাম, ঠিক সেভাবেই শিরোইলের তরুণরা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের বক্সিংয়ের ভবিষ্যৎ: শিরোইলের প্রতিশ্রুতি
শিরোইলের এই বক্সিং-পরম্পরা বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখানকার তরুণরা প্রমাণ করেছে, অবকাঠামোর অভাব কখনোই প্রতিভার বিকাশকে আটকাতে পারে না। তবে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। স্থায়ী রিং নির্মাণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মানের কোচিং নিশ্চিত করা গেলে শিরোইল থেকে আরও অনেক সেলিম ও উৎসব উঠে আসবে।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়ে বাংলাদেশ যখন উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে, তখন ক্রীড়াঙ্গনেও আমাদের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিরোইলের মতো জায়গাগুলোকে সরকারি সহায়তা দিলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পতাকা আরও উঁচুতে ওড়ানো সম্ভব।
ডোপিং নিয়ে বাংলাদেশের বাড়ছে ভয়: কেন?
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে সম্প্রতি ডোপিং নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গিয়ে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি অ্যাথলিট ডোপিং পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন। এর ফলে দেশের ক্রীড়া-সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতার অভাব এবং সঠিক প্রশিক্ষণের অভাবে অনেক অ্যাথলিট অজান্তেই নিষিদ্ধ ওষুধ সেবন করেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা ও পুষ্টি সহায়তার অভাবে ক্রীড়াবিদরা বিভিন্ন ওষুধের দিকে ঝুঁকছেন। ডোপিং রোধে প্রয়োজন কঠোর নজরদারি এবং ক্রীড়াবিদদের নিয়মিত সচেতনতা প্রশিক্ষণ।