এআই যুগে চাকরির বাজারে অনিশ্চয়তা: ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ছাঁটাইয়ের ঢেউ ও আমাদের করণীয়
বহুজাতিক তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা ওরাকলের ভারতের প্রায় তিন হাজার কর্মচারী পহেলা সেপ্টেম্বর ভোর ছয়টায় ঘুম ভেঙে দেখেন, ইনবক্সে অপেক্ষা করছে এক চরম দুঃসংবাদ। সেদিনের সেই ইমেইলটি ছিল তাদের চাকরি হারানোর নোটিশ। সামাজিক মাধ্যমে এই ঘটনাকে 'সিক্স এএম হরর' বা সকাল ছয়টার বিভীষিকা নাম দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনা যেমন আমাদের শেখায় আত্মনির্ভরতা ও মেধার বিকাশ, তেমনি বিশ্বের এই ক্রান্তিকাল আমাদের সামনে তুলে ধরে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির ভবিষ্যৎ চিত্র। ১৯৭১ সালে আমরা যেমন নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য লড়েছিলাম, আজ প্রযুক্তির এই নতুন যুগে আমাদের মেধা ও কর্মসংস্থান রক্ষার লড়াইও তেমনই গুরুত্বপূর্ণ।
কেন ভারতে এত বড় মাপের ছাঁটাই?
দ্য ইকোনমিক টাইমসের রিপোর্ট অনুযায়ী, ওরাকল সম্প্রতি ভারতে তাদের কর্মী সংখ্যা পুনর্গঠন করছে। এই সংস্থাটি মোট ১৩ হাজার কর্মী ছাঁটাই করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা দেশটিতে তাদের মোট কর্মীসংখ্যার ১০ শতাংশ। শুধু ওরাকলই নয়, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে আন্তর্জাতিক ই-কমার্স জায়ান্ট অ্যামাজনও ভারতে প্রায় ১৪ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে বলে দ্য হিন্দু পত্রিকা জানিয়েছে।
মার্কেট রিসার্চ সংস্থা ট্রেন্ড-এর কর্ণধার পারেখ জৈন জানিয়েছেন, মাইক্রোসফটও ভারতে প্রায় ৫০০ কর্মীকে 'পারফরম্যান্স ইম্প্রুভমেন্ট প্রোগ্রাম'-এর আওতায় এনেছে, যেখানে কাজের ওপর কঠোর নজরদারি চালানো হয়। দেশীয় সংস্থা ওলা ইলেকট্রিক ও জোম্যাটোতেও দুই শতাধিক ছাঁটাইয়ের খবর পাওয়া গেছে। ফলে ভারতের দক্ষ কর্মচারীদের মধ্যে চাকরির বাজার নিয়ে অনিশ্চয়তা দিন দিন বাড়ছেই।
এআই কি এই ছাঁটাইয়ের মূল কারণ?
সামাজিক মাধ্যমে এই ছাঁটাইয়ের পেছনে এআই ডেটা সেন্টার ও অটোমেশন প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির দিকেই আঙুল তুলছেন অনেকেই। কর্পোরেট বিশেষজ্ঞ আনমোল গার্গ সম্প্রতি এক রিলে বলেছেন, ওরাকল আর্থিক ক্ষতির মুখে নেই, কিন্তু তারা এআই ডেটা সেন্টার কেনার জন্য কর্মী ছাঁটাই করে বাজেট তৈরি করছে।
তবে অ্যামাজন ও ওরাকলের মতো সংস্থাগুলো এআই ব্যবহার ও অটোমেশন প্রযুক্তি বৃদ্ধির কথা একাধিকবার বললেও, এই কারণেই যে তারা ছাঁটাই করছে, তা কখনো স্পষ্টভাবে স্বীকার করেনি। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবর অনুযায়ী, অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস সম্প্রতি ১০ হাজার কোটি ডলার পুঁজি সংগ্রহ করছেন, যার মূল লক্ষ্য হলো ম্যানুফ্যাকচারিং ফার্ম কিনে অটোমেশন ও এআই-এর সাহায্যে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো।
বিল গেটসের সতর্কবার্তা ও 'হিউম্যান রিজার্ভড' ধারণা
মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস তার ব্যক্তিগত ব্লগ 'গেটস নোটস'-এ 'দ্য টার্বুলেন্ট এরা অফ এআই ইজ হিয়ার' শীর্ষক প্রবন্ধে বিপুল পরিমাণ চাকরি ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটের সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের এমন কিছু কাজ নির্দিষ্ট করে রাখতে হবে যা কেবল মানুষেরাই করবে। এই ধারণাকে তিনি 'হিউম্যান রিজার্ভড' বলে অভিহিত করেছেন।
গবেষকদের উদ্বেগ: এআই যুগে অর্থনীতির টিকে থাকা
চলতি বছরের জুন মাসে বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গেরি সৌকালাস ও ব্রেট ফল্ক 'এআই লেঅফ ট্র্যাপ' শীর্ষক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। সেখানে সতর্ক করা হয়েছে, যদি সব কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যায় এবং মানুষের জায়গায় রোবট চলে আসে, তবে পণ্য কেনার জন্য শেষ পর্যন্ত কারা অবশিষ্ট থাকবে? গবেষণাপত্রটি বলেছে, যদি প্রতিটি কোম্পানিই বিপুল সংখ্যক কর্মী ছাঁটাই করে, তবে শেষ পর্যন্ত এমন খুব কম মানুষই অবশিষ্ট থাকবে যাদের কাছে কোনো কিছু কেনার এবং অর্থনীতিকে সচল রাখার মতো পর্যাপ্ত অর্থ থাকবে।
অধ্যাপক সৌকালাস বিবিসি গ্লোবালকে বলেন, সম্পদের বণ্টনের ক্ষেত্রে এমন ব্যাপক বৈষম্য দেখা দেবে যা আগে কখনও দেখা যায়নি। এই বৈষম্য রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং আরও নানা ধরনের জটিল পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে।
এআই নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ কি সম্ভব?
এআই-এর গতি কমানোর জন্য বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে চুক্তি করা অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করেন অধ্যাপক সৌকালাস। তার মতে, আলোচনার কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার ঠিক পরেই প্রতিটি সংস্থা ভাবতে শুরু করবে যে, এআই প্রযুক্তি গ্রহণ করলে কী কী সুবিধা বা বাড়তি লাভ পাওয়া সম্ভব। এজন্য 'শাস্তি ও পুরস্কারের' এমন একটি ব্যবস্থা জরুরি, যেখানে শাস্তির বিষয়টি বেশ কঠোর হতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি এক নতুন প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সন্ধিক্ষণে। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যেমন শিখিয়েছিল আত্মপরিচয় রক্ষার লড়াই, তেমনি আজকের এআই যুগ আমাদের শেখায় প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভর হওয়ার প্রয়োজনীয়তা। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে, যেন বহুজাতিক সংস্থার ছাঁটাইয়ের ধাক্কায় আমাদের অর্থনীতি বিপর্যস্ত না হয়।
ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, প্রতিটি সংগ্রামেই আমরা প্রমাণ করেছি, সংকট মোকাবিলায় আমরা সক্ষম। এআই-এর এই ক্রান্তিকালেও আমাদের সেই ঐক্যবদ্ধ চেতনাই হবে আমাদের পাথেয়। নিজেদের মেধা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের এমন এক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রযুক্তি হবে আমাদের সহযোগী, প্রতিপক্ষ নয়।