খেইবার শেকান: ইরানের 'দুর্গ ধ্বংসকারী' ক্ষেপণাস্ত্রে কাঁপছে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
আসিফ রহমান | ১ আগস্ট ২০২৬
পাঁচ মাস পেরিয়ে গেছে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার। আক্রমণ-প্রতি আক্রমণের এই লড়াই থামার কোনো লক্ষণ নেই। বরং দিন দিন তা আরও ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। এরই মধ্যে পারস্য উপসাগরে ইরানের একটি নতুন অস্ত্র মার্কিন সামরিক কর্তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। তেহরান এই ক্ষেপণাস্ত্রের নাম দিয়েছে 'খেইবার শেকান', যার অর্থ 'খাইবারের দুর্গ ধ্বংসকারী'।
এই অস্ত্রের সক্ষমতা নিয়ে ইতিমধ্যেই কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন, 'পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ইরান তাদের রণকৌশলে বড় পরিবর্তন এনেছে। তারা এখন খেইবার শেকান নামের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, যা মাঝ-আকাশে বিদ্যুৎ গতিতে পথ পরিবর্তন করতে সক্ষম।'
খেইবার শেকান কেন মার্কিন প্রতিরক্ষার জন্য চ্যালেঞ্জ?
মার্কিন সেনা কর্মকর্তাদের মতে, এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণেই পশ্চিম এশিয়ায় মোতায়েন মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে খেইবার শেকানকে আটকাতে। সাধারণত ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র একটি নির্দিষ্ট গতিপথ মেনে চলে, যা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে আঘাত করা তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু খেইবার শেকান আক্রমণের সময় বারবার গতিপথ বদলাতে পারে, যা মার্কিন এয়ার ডিফেন্সের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে খেইবার শেকানের বিশেষত্ব কী?
পেন্টাগন সূত্রে জানা গেছে, ইরানি বাহিনী সাধারণত ড্রোনের ঝাঁকের সঙ্গে এই ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে মার্কিন ঘাঁটি নিশানা করছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার ক্ষমতা রয়েছে তাদের। ২০২২ সালে ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ক্ষেপণাস্ত্র বহরে যুক্ত হয় খেইবার শেকান। কঠিন জ্বালানিচালিত এই অস্ত্রের আনুমানিক পাল্লা ১,৪০০ থেকে ২,৪০০ কিলোমিটার। এর গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ৯,৬৫৭ কিলোমিটার এবং এটি ৫৫০ কেজির বেশি বিস্ফোরক বহন করতে সক্ষম।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, তরল জ্বালানির পরিবর্তে কঠিন জ্বালানি ব্যবহার করায় দীর্ঘ সময় ধরে এই ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া খুব অল্প সময়ের মধ্যেই খেইবার শেকান উৎক্ষেপণ করা যায় এবং ব্যবহারের পর দ্রুত স্থান পরিবর্তনেও কোনো বাধা নেই। অতীতে তরল জ্বালানি ভরতে সময় লাগত এবং ট্রাকে করে পরিবহণ ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। খেইবার শেকানে এসব সমস্যার কোনো বালাই নেই।
ইতিহাসের সঙ্গে খেইবার শেকানের সম্পর্ক
খেইবার শেকানের নামের সঙ্গে একটি ধর্মীয় ইতিহাস জড়িত। ৬২৮ সালে সৌদি আরবের খাইবার মরূদ্যানে ইহুদিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিলেন স্বয়ং পয়গম্বর হজরত মহম্মদ। সেই যুদ্ধে ইহুদিরা পরাজিত হয়ে পালাতে বাধ্য হয়। সেই সংঘর্ষের স্মৃতি মনে রেখে ইসরায়েল ধ্বংসের লক্ষ্যে এই ক্ষেপণাস্ত্রের নাম 'খেইবার' রেখেছে কট্টরপন্থী ইরান।
মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, এই ক্ষেপণাস্ত্রের সামনের অংশে একটি ছোট ইঞ্জিন লাগানো হয়েছে, যা লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছে গতিপথ বদলাতে পারে। হামলার মুহূর্তে বিস্ফোরকবোঝাই অংশটি মূল ক্ষেপণাস্ত্র থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধে তেহরানের এই অস্ত্র প্রায় অজেয় হয়ে উঠেছে।
খেইবার শেকানের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এর দাম। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে দাম প্রকাশ করেনি তেহরান, পশ্চিমি গণমাধ্যমের দাবি, মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষার ইন্টারসেপ্টর রকেটের তুলনায় এটি যথেষ্ট সস্তা। প্যাট্রিয়ট এবং থাড ব্যবস্থার একটি ইন্টারসেপ্টর রকেটের দাম ৪০ থেকে ৬০ লাখ ডলার, আর মার্কিন নৌবাহিনীর এসএম-৬ ইন্টারসেপ্টরের মূল্য ৫০ লাখ ডলারের বেশি। ফলে তেহরানের সঙ্গে সংঘর্ষে আর্থিক যুদ্ধেও পিছিয়ে পড়ছে আমেরিকা।
চীন ও পাকিস্তানের ভূমিকা
পেন্টাগনের অনুমান, চীনের বেইডু উপগ্রহভিত্তিক দিক নির্দেশকারী ব্যবস্থার সাহায্য পাচ্ছে ইরান। তার ভিত্তিতেই খেইবার শেকান উৎক্ষেপণ করছে আইআরজিসি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ প্যাট্রিসিয়া মারিন্স জানিয়েছেন, ইরানি সেনার বহরে খেইবার শেকানের কোনো অভাব নেই। ওই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর এক তৃতীয়াংশই চীনের বেইডু ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত। অন্যদিকে, আকাশ প্রতিরক্ষার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ইন্টারসেপ্টর রকেট ইতিমধ্যেই ব্যবহার করে ফেলেছে আমেরিকা।
ইরান যুদ্ধে পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সেনা কর্মকর্তারা। তাঁদের দাবি, তেহরানকে সরাসরি অস্ত্র সরবরাহ করছে চীন। পাক অধিকৃত কাশ্মীর হয়ে ইসলামাবাদের মাধ্যমে সেগুলো পৌঁছাচ্ছে আইআরজিসির কাছে। সবকিছুই হচ্ছে রাওয়ালপিন্ডির ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নির্দেশে।
চলতি বছরের ১৩-১৫ মে চীন সফর করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেছিলেন, 'ইরান সংঘাতে নাক গলাবে না বলে আশ্বাস দিয়েছে বেইজিং।' কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত হওয়ায় প্রশ্নের মুখে পড়েছেন তিনি। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, 'এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। প্রেসিডেন্ট শি আমাকে কথা দিয়েছিলেন। তারপরেও এই আচরণ একেবারেই কাম্য নয়।'
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পাকিস্তানের সেনাসর্বাধিনায়ক মুনিরকে বহুবার প্রকাশ্যে 'আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল' বলে সম্বোধন করেছেন ট্রাম্প। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতিতে চীনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তিনি 'মীরজাফরের' ভূমিকা পালন করছেন বলে দাবি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়, শত্রুর বিরুদ্ধে টিকে থাকতে হলে নিজেদের অস্ত্র ও প্রযুক্তিতে সক্ষম হতে হবে। ১৯৭১ সালে আমরা যেমন অস্ত্রের অভাব পূরণ করেছিলাম দেশপ্রেম ও সংকল্প দিয়ে, তেমনি আজকের বিশ্বে প্রযুক্তিগত স্বাধীনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রমাণ করে, সীমিত সম্পদ নিয়েও সঠিক কৌশল ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে শক্তিশালী শত্রুর মোকাবিলা করা সম্ভব।