এআই কি বাংলাদেশের তরুণদের স্বপ্ন কেড়ে নেবে? ১৯৭১-এর চেতনায় প্রস্তুতির ডাক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দ্রুত এগিয়ে চলেছে, আর এর সঙ্গে বেড়েই চলেছে চাকরির বাজার নিয়ে উদ্বেগ। বিশেষ করে শ্রমবাজারে নতুন করে পা রাখা তরুণদের জন্য এই আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। এআই এখন কোড লেখা, নথি সংক্ষেপ করা, তথ্য বিশ্লেষণ আর গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কাজগুলোই করছে, যেগুলো দিয়ে অনেক তরুণের কর্মজীবন শুরু হয়।
এআই কি সত্যিই চাকরি কেড়ে নেবে?
এআই খাতের কয়েকজন নেতা দাবি করছেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই শুরুর দিকের সাদা কলারের বেশিরভাগ চাকরি বিলীন হয়ে যাবে। তবে এখন পর্যন্ত তার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। কিছু প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরিতে এআইয়ের প্রভাব দেখা যাচ্ছে, কিন্তু তা সীমিত ও অসম। পুরো অর্থনীতিতে ব্যাপক চাকরি হারানোর স্পষ্ট লক্ষণও নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এআইয়ের সংস্পর্শে থাকা কাজের কারণে সামগ্রিক কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে ২২ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে এআইয়ের প্রভাব বেশি, এমন পেশায় কর্মসংস্থান কমেছে। এসব পেশায় তাঁদের কর্মসংস্থান তুলনামূলক কম এআইনির্ভর খাতে কর্মরত তরুণদের হারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চললে যতটা হওয়ার কথা ছিল, তার চেয়ে ১৯ শতাংশ কম। এখানে ছাঁটাইয়ের চেয়ে নতুন নিয়োগ কমে যাওয়াই বড় কারণ।
তবে এই তথ্য সতর্কতার সঙ্গে দেখতে হবে। এআইয়ের প্রভাব বেশি, এমন পেশায় প্রাথমিক পর্যায়ের নিয়োগ ২০২২ সাল থেকেই কমতে শুরু করে। তখন চ্যাটজিপিটি সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য আসেনি এবং এআইয়ের সক্ষমতাও সীমিত ছিল। ফলে ওই সময়ের নিয়োগ কমানোর কারণ এআই না হয়ে সুদের হার বৃদ্ধি, মহামারির পর অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস এবং দূর থেকে কাজের প্রবণতা হতে পারে।
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এআইয়ের চ্যালেঞ্জ কী?
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এআইয়ের প্রভাব নিয়ে ভাবনার সময় এসেছে। ১৯৭১ সালে আমরা যেমন ভাষা ও স্বাধীনতার জন্য লড়েছিলাম, আজ সেই চেতনায় আমাদের প্রযুক্তির নতুন এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এআই যেন আমাদের তরুণদের সম্ভাবনাকে কেড়ে না নেয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
২০২৪ সাল থেকে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রাথমিক পর্যায়ের নিয়োগ কমেছে। এর পেছনে এআইয়ের ভূমিকা থাকতে পারে। তবে প্রযুক্তি খাতের বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রযুক্তিকর্মীর চাহিদা এখনো শক্তিশালী। আবার যেসব ক্ষেত্রে এআই মানুষের কাজকে প্রতিস্থাপন না করে সহায়তা করছে, সেসব ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান স্থিতিশীল রয়েছে বা বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের বেকারত্বের সঙ্গে সামগ্রিক শ্রমশক্তির বেকারত্বের ব্যবধানও কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি। অর্থাৎ এআইয়ের সংস্পর্শে থাকা সব চাকরি হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে নেই।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এআইয়ের প্রভাব কেমন?
যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের পরিস্থিতি আরও ভিন্ন। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে চ্যাটজিপিটি চালুর পর এআই দিয়ে প্রতিস্থাপনের ঝুঁকিতে থাকা পেশার অনলাইন চাকরির বিজ্ঞপ্তি তুলনামূলক কম ঝুঁকির পেশার চেয়ে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে।
এশিয়ায় দেশভেদে এআইয়ের প্রভাবও আলাদা। দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এআইয়ের প্রভাব বেশি, এমন শিল্পে তরুণদের কর্মসংস্থান তুলনামূলক বেশি কমেছে। বিপরীতে পঞ্চাশোর্ধ্ব কর্মীদের কর্মসংস্থান বেড়েছে। তবে এই পরিবর্তনের কতটা এআইয়ের কারণে, আর কতটা অর্থনৈতিক, জনমিতিক ও শ্রমবাজারের অন্যান্য পরিবর্তনের কারণে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
আসিয়ান দেশগুলোতেও এআইয়ের প্রভাব রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাবে, ২০২৫ সালে আসিয়ানের মোট কর্মসংস্থানের ২২ দশমিক ৯ শতাংশ এমন পেশায় ছিল, যেগুলো প্রজন্মগত এআইয়ের অন্তত কিছুটা প্রভাবের আওতায় পড়ে। তবে সর্বোচ্চ ঝুঁকির পেশায় ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ কর্মী।
চীনে দ্রুত এআই ব্যবহারের ফলে ট্যাক্সিচালক থেকে সাদা কলারের পেশাজীবী, কিছু কর্মীর ওপর চাকরি হারানোর চাপ তৈরি হচ্ছে। এটি শ্রমবাজারে প্রবেশ করা তরুণদের সমস্যাকে আরও বাড়াতে পারে। তবে চীনের উচ্চ যুব বেকারত্ব এআইয়ের উত্থানের আগেই শুরু হয়েছে।
ভারতে ঝুঁকি বেশি কেন্দ্রীভূত তথ্যপ্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক সেবা খাতে। শিল্পনেতারা এআইয়ের কারণে ব্যাপক ছাঁটাইয়ের বিষয়টি অস্বীকার করলেও বড় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মীসংখ্যা কমেছে।
জাপানের পরিস্থিতি ভিন্ন। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধাবস্থা দেশটিতে বড় শ্রমিকসংকট তৈরি করছে। তাই সেখানে এআইকে হুমকির চেয়ে সমাধানের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
এআই যুগে প্রস্তুতির উপায় কী?
এশিয়ার দেশগুলোতে তরুণদের এআইয়ের সঙ্গে কার্যকরভাবে কাজ করার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন জরুরি। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এআই ব্যবহার ও ডিজিটাল দক্ষতার পাশাপাশি বিশ্লেষণী চিন্তা, বিচারবোধ, যোগাযোগ, সৃজনশীলতা ও দলগত কাজের মতো সহজে স্বয়ংক্রিয় করা যায় না, এমন দক্ষতা শেখাতে হবে। এআই যেন শিক্ষাকে শক্তিশালী করে, শিক্ষার বিকল্প না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
শুধু এআই প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়। শক্তিশালী শ্রমবাজার প্রতিষ্ঠান ও কার্যকর অর্থনৈতিক নীতিও প্রয়োজন। এমন শ্রমনীতি দরকার, যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো তরুণদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দিতে পারে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও প্রতিযোগিতার পরিবেশ উৎপাদনশীল চাকরি তৈরির জন্য অপরিহার্য।
এআই এশিয়ার শ্রমবাজারকে প্রায় নিশ্চিতভাবেই বদলে দেবে। এর প্রভাব তরুণ কর্মীরাই হয়তো প্রথম অনুভব করবেন। তবে পরিবর্তনটি এআই খাতের কিছু নেতার আশঙ্কার মতো নাটকীয় না-ও হতে পারে। এআইয়ের সম্ভাব্য পরিবর্তনের সবচেয়ে কার্যকর প্রস্তুতি হলো এমন দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সুযোগ তৈরি করা, যার মাধ্যমে মানুষ প্রযুক্তিটিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারে।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে আমরা যেমন স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম, তেমনি আজ এআইয়ের এই নতুন যুগে আমাদের তরুণদের সক্ষমতা গড়ে তোলাই হবে দেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার মূল চাবিকাঠি।
লি জং-হোয়া কোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ।