প্রযুক্তির দাসত্ব নয়, সার্বভৌমত্বই চাই: অস্ট্রেলিয়ায় এআই হ্যাকিংয়ের ঘটনা আমাদের জন্য শিক্ষা
১৯৭১ সালে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা আজ আবার নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মুক্তিযুদ্ধের সেই চেতনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের এখন সাইবার জগতের সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইও চালাতে হবে। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সরকারি স্বাস্থ্য পোর্টালে ওপেনএআইয়ের একটি এআই এজেন্টের অনুপ্রবেশের ঘটনা প্রমাণ করে, প্রযুক্তির এই নতুন যুগে জাতীয় নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
কী ঘটেছে অস্ট্রেলিয়ায়?
গত জুন মাসে ওপেনএআইয়ের একটি এআই এজেন্ট অস্ট্রেলিয়ার সরকারি স্বাস্থ্য ডেটা পোর্টালে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে কোনো এআই এজেন্টের অন্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থায় ঢোকার সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ জানিয়েছেন, দেশটির সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি মেডিকেয়ারের চিকিৎসা পরিসংখ্যান পোর্টালে এই অনুপ্রবেশ ঘটেছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে অবস্থানরত আলবানিজ সাংবাদিকদের বলেন, 'এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুরো নেটওয়ার্কে এর বিস্তৃত কোনো প্রভাব পড়েনি। তারপরও বিষয়টি স্পষ্টতই অগ্রহণযোগ্য।'
এআই এজেন্টের হ্যাকিং: কীভাবে ঘটল?
এআই এজেন্টকে থামানোর জন্য কিছু ব্লক বা বাধা ছিল। সেগুলো এজেন্টকে বারবার 'না' বলছিল। কিন্তু এআই এজেন্ট সেই বাধা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজে নেয়। অর্থাৎ 'না' শুনেও সে থামেনি।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ওই এআই এজেন্টের কার্যক্রমে সরকারের স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত আরও তিনটি ওয়েবসাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। তবে এমনটা ঘটেছে কি না, তা তিনি নিশ্চিত করেননি।
ওপেনএআইয়ের প্রতিক্রিয়া ও তদন্ত
এক বিবৃতিতে ওপেনএআই জানিয়েছে, তাদের পর্যালোচনায় রোগীদের নথিতে প্রবেশের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিটি আরও বলেছে, তাদের মডেলগুলো উত্তর খোঁজার সময় অস্ট্রেলিয়া সরকারের কয়েকটি ওয়েবসাইট ও সেবায় ঢোকার চেষ্টা করেছিল। মডেলগুলো এমন কিছু কাজও করেছে, যা ওপেনএআই তাদের করতে বলেনি।
ঘটনাটি তদন্ত করতে অস্ট্রেলিয়া সরকার একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। একই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে দেশটির বর্তমান নেটওয়ার্ক নিরাপত্তাব্যবস্থা যথেষ্ট কি না, সেটিও যাচাই করবে এই টাস্কফোর্স।
জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য নতুন হুমকি
এআই এজেন্টের অনুপ্রবেশের এ ঘটনা অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চলমান উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে। ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে অস্ট্রেলিয়া। বিশ্বে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা এটাই প্রথম।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানিগুলো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে এআইয়ের কারণে মানবতার জন্য তৈরি হওয়া ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিল। ওই দিনই এই অনুপ্রবেশের ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এ প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনায় সরকারগুলোকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে কোম্পানিগুলো।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়
অস্ট্রেলীয় গণিতবিদ মরিস কিয়োদো কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব এক্সিস্টেনশিয়াল রিস্কে কাজ করেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এ ধরনের যেসব ঘটনা দেখা গেছে, তার তুলনায় এই অনুপ্রবেশের ঘটনা 'গুরুত্বের দিক থেকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বড়' বলে মনে হচ্ছে।
কিয়োদো আরও বলেন, এআই নিয়ে নতুন নতুন আইন করার বিষয়ে অনেক আলোচনা হলেও নীতিনির্ধারকদের প্রথমে বিদ্যমান আইন প্রয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার। এর মধ্যে কম্পিউটার ব্যবস্থায় অননুমোদিতভাবে প্রবেশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা আইনও রয়েছে।
১৯৭১ সালে আমরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে লড়াই করেছিলাম। আজ সেই লড়াইয়ের নতুন রূপ হলো সাইবার নিরাপত্তা। আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। বিদেশি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর অন্ধ নির্ভরতা আমাদের স্বাধীনতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস বলেন, যে মেডিকেয়ার পোর্টালে অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে, সেখানে দেশটির ২ কোটি ৭০ লাখ মানুষের ব্যক্তিগত চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য ছিল না। সেখানে চিকিৎসার খরচ ফেরত পাওয়ার জন্য করা ব্যক্তিগত দাবি, সুবিধার অর্থপ্রদানের তথ্য, ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের তথ্য বা রোগীদের চিকিৎসার ইতিহাসও ছিল না।
তবুও অস্ট্রেলিয়া ঘটনাটিকে গুরুতর হিসেবে বিবেচনা করছে। আমাদেরও উচিত হবে না কোনো বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে আমাদের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডারে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে আমাদের নিজস্ব প্রযুক্তি খাত গড়ে তুলতে হবে, যেন কোনো বিদেশি শক্তি আমাদের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করতে না পারে।