কুমিল্লায় আবারও কিশোর গ্যাংবিরোধী এক বৃহৎ অভিযান পরিচালনা করেছে পুলিশ। গতকাল শনিবার রাত আটটা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ১৮টি থানায় একযোগে চালানো এই অভিযানে মোট ২৫৪ জনকে আটক করা হয়েছে। আটকদের মধ্যে রয়েছে কুমিল্লা নগরের আলোচিত 'রতন গ্রুপ' বা 'আর স্কোয়াড'-এর সক্রিয় চার সদস্য, যাদের একজন আনিসুর রহমান ওরফে আনিক (১৯) এই গ্যাংয়ের 'সেকেন্ড ইন কমান্ড'।
কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফুর রহমান জানান, উঠতি বয়সী কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখতে এবং কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা দমন করতে নিয়মিতভাবে এ ধরনের অভিযান চালানো হচ্ছে। শহরের প্রতিটি থানা এলাকায় যেসব স্থানে বখাটেদের উৎপাত ও কিশোর গ্যাংয়ের আড্ডা রয়েছে, সেসব স্থান চিহ্নিত করে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
রতন গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ এখন আনিকের হাতে
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার পুলিশ রাতের অভিযানে নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৩৭ জনকে আটক করেছে। পুলিশের দাবি, তাঁদের মধ্যে চারজনই রতন গ্রুপের সক্রিয় সদস্য এবং সরাসরি কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত। আটক আনিসুর রহমান ওরফে আনিক নগরের ছোটরা মফিজাবাদ কলোনির আবুল কাশের ছেলে। পুলিশের ভাষ্য, আনিক রতন গ্রুপের প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতনের ভাগনে। রতন বর্তমানে আত্মগোপনে থাকায় আনিকই গ্রুপটির পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন।
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, 'আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কিশোর গ্যাং লিডার আনিসুর রহমান আনিকও রয়েছেন। আমরা কিশোর গ্যাংয়ে সরাসরি জড়িত চারজনকে আটক করেছি। তাঁরা সবাই রতন গ্রুপের সক্রিয় সদস্য। আনিসুর রহমান বর্তমানে রতন গ্রুপ বা আর স্কোয়াডের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে রতনের পুরো গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করছেন।'
আনিকের অপরাধের রেকর্ড
পুলিশ জানিয়েছে, ২০২২ সালে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের হাতে সংঘটিত একটি হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন আনিক। ওই মামলায় তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। পরে জামিনে বের হয়ে আবার গ্যাংয়ের নেতৃত্বে যুক্ত হন। ওসি তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, 'শনিবারের অভিযানে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিনতাই ও নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের বিস্তারিত নাম-পরিচয় ও আগের অপরাধের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। এরপর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
এর আগের অভিযানে আটক ৬২৪ জন
এর আগে গত বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কুমিল্লার ১৮টি থানায় একযোগে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে ৬২৪ জনকে আটক করে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে ৪৫১ জনকে মুচলেকায় অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। অপর ১৭৩ জনের বিরুদ্ধে মাদক সেবন, নিয়মিত মামলা, ভ্রাম্যমাণ আদালত, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ বিভিন্ন অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কিশোর গ্যাংবিরোধী তৎপরতা জোরদার
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নতুন নয়। তবে ১৩ বছর বয়সী সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ১৮ সেপ্টেম্বর কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পরদিন সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক। পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অপর একজনকে হত্যাকাণ্ডের সহযোগী হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
কুমিল্লা নগরে আলোচিত কিশোর গ্যাংগুলোর একটি রতন গ্রুপ বা আর স্কোয়াড। ২০১৫ সালের দিকে নগরে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা আলোচনায় আসার পর বিভিন্ন সময়ে গ্রুপটির নাম সামনে এসেছে।