মানব পাচার চক্রের মূল হোতা গ্রেপ্তার: বেকার যুবক-নারীদের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ
ইউরোপে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বেকার যুবক ও নারীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগে একটি আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের মূল হোতাকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) তথ্যের ভিত্তিতে গত সোমবার রাজধানীর বনানীর সি ব্লক এলাকা থেকে মোহাম্মদ আরজুর রহমানকে (৪৭) গ্রেপ্তার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই চক্রের মাধ্যমে প্রতারণা ও মানব পাচারের শিকার বাংলাদেশির সংখ্যা দুই হাজারের বেশি হতে পারে।
কীভাবে চলত এই মানব পাচার চক্র?
এসআরবি-৪-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান গত মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানান, আরজুর রহমান প্রায় ১২ বছর ধরে অবৈধভাবে বিদেশে লোক পাঠানো ও মানব পাচারের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন। বিভিন্ন সময় লাইসেন্সবিহীন বিভিন্ন এজেন্সির নাম ব্যবহার করে তিনি বিদেশে লোক পাঠাতেন। এর মধ্যে 'আরজু ইমিগ্রেশন লিমিটেড' ও 'নাফিস এয়ার ইমিগ্রেশন লিমিটেড' নামের প্রতিষ্ঠানের তথ্য পেয়েছে এসআরবি। গত এক বছরের একটি ব্যাংক হিসাবে তাঁর মোট ১ কোটি ৭০ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫০ টাকা লেনদেনের তথ্যও পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চক্রটি প্রথমে তাদের এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠাত। এরপর নেপাল বা শ্রীলঙ্কা হয়ে মিসর কিংবা লিবিয়ায় এবং সেখান থেকে ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখানো হতো। কয়েকজন ভুক্তভোগী কৌশলে দেশে ফিরে আসতে সক্ষম হলেও কেউ কেউ বিদেশে আটকে পড়েছেন।
দুই হাজারের বেশি মানুষ প্রতারণা ও পাচারের শিকার
এসআরবি জানায়, আরজু রহমানকে গ্রেপ্তারের পর দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন ভুক্তভোগী তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাঁদের অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে দেশে ফিরেছেন। এ ছাড়া এনএসআইয়ের সঙ্গে আরও প্রায় ৩০০ ভুক্তভোগীর যোগাযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন সময়ের ঘটনা, মামলা, অভিযোগ ও পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে এসআরবির প্রাথমিক ধারণা, এই চক্রের মাধ্যমে প্রতারণা ও মানব পাচারের শিকার বাংলাদেশির সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে জনপ্রতি ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো। চক্রটি মূলত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বেকার তরুণ এবং প্রত্যন্ত এলাকার নারীদের লক্ষ্য করত।
নারীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ
চক্রটির বিরুদ্ধে জাল ভিসা ও অন্যান্য নথির মাধ্যমে নারীদের বিদেশে পাচারের অভিযোগও রয়েছে। এসআরবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বিদেশে নেওয়ার পর কোনো কোনো নারীকে অনৈতিক কাজে যুক্ত হতে বাধ্য করা হতো। রাজি না হলে তাঁদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। কোনো কোনো নারীকে জিম্মি করে রাখা, মারধর করা এবং সিগারেট দিয়ে শরীরে ছ্যাঁকা দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। মিসরে থাকা কয়েকজন ভুক্তভোগী সেখান থেকে কৌশলে পালিয়ে পরিবারের সদস্যদের কাছে ভিডিও বার্তায় নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন। এখনো কয়েকজন নারী মিসরে আটকে রয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম চলছে।
দুই বছরে ২২৩ জন গ্রেপ্তার
সংবাদ সম্মেলনে এসআরবি জানায়, ২০২৫ সাল থেকে চলতি বছরের এ পর্যন্ত র্যাব ও পরবর্তী সময়ে এসআরবি মানব পাচারের অভিযোগে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মোট ২২৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তার আরজুর রহমানকে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তাঁর সহযোগী ও চক্রটির অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তদন্ত চলছে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অভিযাত্রায় দেশের জনগণের আত্মমর্যাদা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষা সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের মানব পাচার চক্র দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে এবং সাধারণ মানুষের স্বপ্নকে ধ্বংস করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই অভিযান দেশের সার্বভৌমত্ব ও নাগরিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।