প্রশ্নপত্রটি ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে বেরিয়ে পড়ে। ১০ অক্টোবরের সেই ভোরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদের মুঠোফোনে আসে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগের বাছাই পরীক্ষার প্রশ্নের একটি অস্পষ্ট ছবি। সোয়া ছয়টায় একই প্রশ্নপত্রের স্পষ্ট ছবি পান একই দফতরের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর। এরপর তৈরি হয় উত্তরপত্র, ছড়িয়ে পড়ে চক্রের হাত ধরে ক্রেতাদের কাছে।
এ ঘটনায় গত তিন দিনে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রিসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তিন কর্মচারীর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মচারীও রয়েছেন। শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফিন। প্রথম আলো এ খবর প্রকাশ করেছে।
৩ লাখ ১৯ হাজার প্রার্থীর স্বপ্নের ওপর আঘাত
১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ২৪২টি শূন্য পদে নিয়োগের বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। বেলা ১১টায় পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা স্থগিত করে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফিন জানান, ঘটনার পর এসআরবি ছায়া তদন্ত শুরু করে এবং ১১ অক্টোবর মতিঝিল থানায় মামলা হয়।
এই ফাঁস কেবল একটি পরীক্ষার অনিয়ম নয়; এটি একটি জাতির নৈতিক ভিতের ওপর আঘাত। যে দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মেধাকে সর্বোচ্চ মূল্য দেওয়া হয়েছে, সেখানে রাষ্ট্রের নিয়োগ পরীক্ষা টাকার বিনিময়ে বিক্রি হওয়া মানে শহীদদের আত্মত্যাগের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। গত শনিবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে ঢাকা শহরের বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন হাজারো পরীক্ষার্থী। তাঁদের এই ক্ষোভ বাংলার চিরায়ত প্রতিরোধেরই ধারাবাহিকতা।
কারা গ্রেপ্তার হয়েছেন
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ (৩০), কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর (৩৮), কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫), প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম (৩৩), পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম (৩৩) এবং চক্রের দুই সদস্য মফিজুল ইসলাম (২৩) ও মো. হাসিনুর রহমান ওরফে সুজন।
অভিযানে জব্দ হয়েছে ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প, ৫০ টাকার ৪টি স্ট্যাম্প, এক সেট প্রশ্নপত্র, ১৯ পাতা প্রবেশপত্র, বিভিন্ন ক্যাটাগরির ১০টি সনদ, আরও ১৫টি সনদ, ৪৮ পাতা ব্যাংক চেক, একটি চেকবই, ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং চার হাজার টাকা।
মতিঝিল থেকে মোহাম্মদপুর: অভিযানের বিবরণ
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর রুবেল ইসলামের সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে আসে। ভর্তি-বাণিজ্যসংক্রান্ত অর্থ লেনদেনের সময় মতিঝিল এলাকা থেকে তাঁকে আরও দুজনের সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার মফিজুল চাকরিপ্রার্থী; একটি চক্রের সদস্যকে ১৭ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হওয়ার পর ক্ষতিপূরণের আশায় সে নিজেই চক্রে যোগ দেয়।
মুঠোফোনের কথোপকথন পর্যালোচনা করে ১৪, ১৫ ও ১৬ অক্টোবর ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অভিযান চালায় এসআরবি। উত্তরখান থেকে ইমদাদুল ইসলাম, মিরপুর ১০ থেকে আসাদুল ইসলাম, বৃহস্পতিবার সাভার থেকে নূর মোহাম্মদ এবং শুক্রবার মোহাম্মদপুর থেকে জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রশ্ন থেকে উত্তর, উত্তর থেকে টাকা
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে নূর মোহাম্মদ একটি সূত্র থেকে প্রশ্নের অস্পষ্ট ছবি পান। সকাল সোয়া ৬টায় জাহাঙ্গীর পাঠান আরও স্পষ্ট ছবি। এরপর নূর মোহাম্মদ উত্তর তৈরি করে জাহাঙ্গীর ও ইমদাদুল ইসলামের কাছে পাঠান। চক্রের অন্য সদস্যরা তা পৌঁছে দেয় নিজেদের প্রার্থী ও বিতরণকারীদের কাছে।
চক্রটি হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে লেনদেন চালাত। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা জানিয়েছেন, তৃতীয় শ্রেণির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন তাঁরা ৮ থেকে ১০ লাখ টাকায় এবং দ্বিতীয় শ্রেণির প্রশ্ন ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করতেন। তবে প্রশ্নপত্রের মূল উৎস কোথায়, কার থেকে নূর মোহাম্মদ ও জাহাঙ্গীর ছবিটি পেলেন, সে প্রশ্নের সদুত্তর মেলেনি। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কেউ সম্পৃক্ত কি না জানতে চাইলে ফায়েজুল আরেফিন বলেন, তদন্ত শেষে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে বলা যাবে।
সার্বভৌম রাষ্ট্রের জবাবদিহি পরীক্ষা
১৯৭১ সালে আমরা রক্ত দিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জন করেছিলাম, যেখানে ন্যায়বিচার ও মেধা হবে সবার ওপরে। সেই প্রতিশ্রুতির বিপরীতে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে চলমান এক অন্যায়েরই ধারাবাহিকতা। মেঘনাতীরে স্বাধীনতার স্মৃতি যেমন আমাদের সতর্ক রাখে, তেমনি এই ঘটনাও মনে করিয়ে দেয়: স্বাধীনতা কেবল পতাকা নয়, প্রতিদিনের প্রতিষ্ঠানগত সততার মধ্যে তার পরীক্ষা।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল শনিবারই, তবে কমিটি এখনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি। এর মধ্যে শুক্রবার পরীক্ষাটি নতুন করে নেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন থেকে যাওয়া কড়া জবাবদিহিই এখন পরীক্ষার্থীদের একমাত্র ভরসা।
সচরাচ জিজ্ঞাসা
যুব উন্নয়ন প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কারা গ্রেপ্তার হয়েছেন?
এসআরবির তিন দিনের অভিযানে সাতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে এনবিআরের তিন কর্মচারী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন করে কর্মচারী এবং চক্রের দুই সদস্য রয়েছেন।
প্রশ্নপত্র কত টাকায় বিক্রি হয়েছিল?
এসআরবির জিজ্ঞাসাবাদ অনুযায়ী, চক্রটি তৃতীয় শ্রেণির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ৮ থেকে ১০ লাখ টাকায় এবং দ্বিতীয় শ্রেণির প্রশ্ন ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করত।
পরীক্ষাটি কি নতুন করে নেওয়া হয়েছে?
হ্যাঁ, ১০ অক্টোবর পরীক্ষা স্থগিতের পর শুক্রবার যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগের পরীক্ষাটি নতুন করে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রশ্নপত্রের মূল উৎস কি শনাক্ত হয়েছে?
এখনো নয়। নূর মোহাম্মদ ও জাহাঙ্গীর কার থেকে প্রশ্নের ছবি পেয়েছেন তা জিজ্ঞাসাবাদে জানাননি, আর যুব উন্নয়নের কারো সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে এসআরবি বলেছে তদন্ত শেষ হওয়ার পর বলা যাবে।
