ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অভিযান চালিয়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। গত বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত চালানো এই অভিযানে জানা গেছে, চক্রটি চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে প্রশ্ন ও উত্তর দেওয়ার শর্তে ১০ লাখ টাকার লিখিত চুক্তি করত। গতকাল রোববার আদালতের মাধ্যমে গ্রেপ্তার সদস্যদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে এই চমকপ্রদ তথ্য সামনে এসেছে। চুক্তির শর্ত ছিল নির্মম: চাকরিপ্রার্থীকে তাঁর মূল শিক্ষাসনদ জমা দিতে হতো, আর পুরো টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত সেই সনদ ফেরত পাওয়া যেত না। যাঁরা একসঙ্গে আগাম টাকা দিতে পারতেন না, তাঁদের কাছ থেকে দুই থেকে তিন লাখ টাকার স্বাক্ষরিত ব্যাংক চেক নেওয়া হতো।
কারা গ্রেপ্তার হয়েছেন
গ্রেপ্তার হওয়া সাতজনের মধ্যে পাঁচজনই রাষ্ট্রের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মচারী, যা এই কেলেঙ্কারির গভীরতা বোঝায়। তাঁরা হলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ (৩০), কম্পিউটার অপারেটর মো. জাহাঙ্গীর (৩৮), কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫), প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম (৩৩), পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম (৩৩), এবং চক্রের দুই সদস্য মফিজুল ইসলাম (২৩) ও মো. হাসিনুর রহমান ওরফে সুজন।
অভিযানে চক্রের সদস্যদের কাছ থেকে ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প, চাকরিপ্রার্থীদের ১০টি শিক্ষাসনদ, ৪০ জনের ব্যাংক চেকের পাতা ও চেক বই জব্দ করা হয়েছে। এই জব্দকৃত কাগজপত্রই প্রমাণ করে, প্রশ্ন বিক্রির এই ব্যবসা কতটা সংগঠিতভাবে চলত। এর আগেও এই ঘটনায় এনবিআর ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাতজনের গ্রেপ্তারের খবর আমরা প্রকাশ করেছিলাম।
চুক্তির নিয়ম কী ছিল
এসআরবি ৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তর দেওয়ার শর্তে চক্রের সদস্যরা চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে স্ট্যাম্পে ১০ লাখ টাকার লিখিত চুক্তি করত। পুরো টাকা পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত প্রার্থীদের মূল শিক্ষাসনদ চক্রের হেফাজতেই থাকত।
তিনি বলেন, যাঁরা একসঙ্গে আগাম টাকা দিতে পারতেন না, তাঁদের কাছ থেকে স্বাক্ষর করা ব্যাংকের চেকের পাতা নেওয়া হতো; প্রতিটি চেকের বিপরীতে দুই থেকে তিন লাখ টাকা করে লেখা থাকত।
এসআরবির আরেকজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, স্বাক্ষরসহ অন্তত ৪০ জন চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে এভাবে ব্যাংক চেক নেওয়া হয়েছে। প্রশ্নপত্র কার কাছ থেকে, কীভাবে চক্রের হাতে পৌঁছেছিল, তা এখনো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ভোর চারটা থেকে সকাল ছয়টা: প্রশ্ন ফাঁসের টাইমলাইন
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে মুঠোফোনে প্রশ্নপত্রের একটি অস্পষ্ট ছবি পান এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ। এর কিছুক্ষণ পর, সকাল সোয়া ছয়টার দিকে, একই প্রশ্নপত্রের আরও স্পষ্ট ছবি পান একই প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর।
এরপর প্রশ্নপত্রের উত্তর তৈরি করে চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়। তাঁদের মাধ্যমে সেই উত্তরপত্র ছড়িয়ে পড়ে সম্ভাব্য পরীক্ষার্থী ও প্রশ্নপত্রের গ্রাহকদের কাছে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীনের ভাষ্যে, এনবিআরের কর্মচারীদের হাত ঘুরে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের উত্তর এভাবেই চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে গিয়ে পৌঁছায়।
৩ লাখ ১৮ হাজার প্রার্থীর স্বপ্ন, ২৪২টি পদ
১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগের বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ২৪২টি শূন্য পদের বিপরীতে এই পরীক্ষায় যোগ্য বিবেচিত হয়েছিলেন ৩ লাখ ১৮ হাজার ৯৭৬ জন চাকরিপ্রার্থী। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঢাকা মহানগরের ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমসিকিউ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর ছড়িয়ে পড়ে। সকাল ১০টা ৩ মিনিটে ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা স্থগিত করে। পরদিন ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. আতিকুর রহমান বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় মামলা করেন।
তদন্ত এখন কোথায়
মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মীর্জা মোহাম্মদ মুক্তা জানান, রোববার মামলার নথিপত্র সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।
এদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তদন্তে গত শনিবার পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে গঠিত কমিটি এখনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি। এর মধ্যেই গত শুক্রবার নতুন করে নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।
স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি আর প্রশ্ন ফাঁসের বাস্তবতা
১৯৭১ সালে আমরা একটি রাষ্ট্র পেয়েছিলাম, যার স্বপ্ন ছিল ন্যায়ের সমাজ, মেধার মূল্যায়ন আর সমান সুযোগ। সেই স্বপ্নের রাষ্ট্রে আজ যদি চাকরির প্রশ্ন ১০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়, তাহলে প্রশ্ন করতে হয়, আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। গ্রামের এক মেধাবী তরুণ, যে বছরের পর বছর অন্ধকার ঘরে পড়াশোনা করে সরকারি চাকরির স্বপ্ন দেখে, তার কাছে এই খবর এক আঘাত। কারণ সে জানে, প্রশ্ন কিনে পাওয়া প্রার্থীর সঙ্গে তার প্রতিযোগিতা মূলত অসম।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই চক্রের সদস্যরা বহিরাগত নয়; তাঁরা রাষ্ট্রেরই নিয়োজিত কর্মচারী। এনবিআর, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা যদি জাতির সম্পদের পাহারাদার হয়ে সেই সম্পদই বিক্রি করে, তবে রাষ্ট্রের ভিত নড়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রাষ্ট্র গড়েছিলাম আস্থার ভিত্তিতে; সেই আস্থাই আজ প্রশ্নবিদ্ধ।
তবে এসআরবির দ্রুত অভিযান একটি পজিটিভ বার্তা দেয়। চক্রের সাতজন গ্রেপ্তার হয়েছে, আদালতে পাঠানো হয়েছে, তদন্ত চলছে। কিন্তু এই ঘটনার মূল হোতারা, যাঁরা প্রশ্নপত্রের উৎসে বসে আছেন, তাঁরা এখনো ধরা পড়েননি। প্রশ্নপত্র ছাপাখানা থেকে পরীক্ষার হল পর্যন্ত যে সিন্ধু পথ আছে, সেখানে যাঁরা পাহারা দেন, তাঁদের দায় নির্খর হয়ে থাকে। দেশের তরুণ প্রজন্ম, যারা একাত্তরের স্বাধীনতার উত্তরাধিকার, তারা প্রত্যাশা করে একটি স্বচ্ছ তদন্ত, যেখানে কেউ প্রভাবশালী হয়ে পার পেয়ে যাবে না। মামলার নথি এখন সিআইডির হাতে; দেশ অপেক্ষায় থাকবে কে জড়িত, তার পূর্ণ তালিকা প্রকাশের জন্য।
প্রশ্ন ফাঁসের চক্র কীভাবে কাজ করত?
চাকরিপ্রার্থীরা কত টাকা দিতেন?
নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তর পাওয়ার জন্য চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে ১০ লাখ টাকার লিখিত চুক্তি করা হতো বলে এসআরবি ৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানিয়েছেন।
টাকা না দিলে কী হতো?
পুরো টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত প্রার্থীর মূল শিক্ষাসনদ চক্রের হেফাজতে থাকত। আগাম টাকা না দিতে পারলে দুই থেকে তিন লাখ টাকার স্বাক্ষরিত ব্যাংক চেক জমা দিতে হতো।
প্রশ্নপত্র কখন ফাঁস হয়?
১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে এনবিআরের কর্মী নূর মোহাম্মদ মুঠোফোনে প্রশ্নের ছবি পান, সকাল ১০টা ৩ মিনিটে ফাঁস নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
