কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে আরও ৪১৫ জন আটক, পাঁচ দিনে মোট ১ হাজার ২৯৩ জন
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জেলার ১৮টি থানায় একযোগে চালানো সর্বশেষ অভিযানে আরও ৪১৫ জনকে আটক করেছে পুলিশ। গত পাঁচ দিনে তিন দফা অভিযানে মোট ১ হাজার ২৯৩ জনকে আটক করা হয়েছে, যা সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূলে এক দৃঢ় প্রত্যয়ের বহিঃপ্রকাশ।
অভিযানের বিবরণ: কখন ও কোথায় চালানো হয়?
গতকাল রোববার সন্ধ্যা সাতটা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সমন্বয়ে এ অভিযান চালানো হয়। কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান গতকাল রোববার দিবাগত রাত দুইটার দিকে প্রথম আলোকে এসব তথ্য জানান।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন,
'কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে এমন বিভিন্ন স্থান, কিশোরদের আড্ডাস্থল ও অপরাধপ্রবণ এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে। গত কয়েক দিনের ধারাবাহিক অভিযানের ফলে একদিকে কুমিল্লাবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে, অন্যদিকে অপরাধপ্রবণতাও কমে আসছে। আমরা কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এ অভিযানের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে চাই।'
পাঁচ দিনে তিন দফা অভিযানে ১ হাজার ২৯৩ জন আটক
এর আগে কুমিল্লায় গত বুধবার ও শনিবার রাতে একইভাবে অভিযান চালিয়ে ৮৭৮ জনকে আটক করেছিল পুলিশ। তাঁদের মধ্যে ৫৯৭ জনকে মুচলেকায় পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। অন্য ২৮১ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে গত পাঁচ দিনে তিন দফা অভিযানে ১ হাজার ২৯৩ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
বুধবার রাতে ৬২৪ জন আটক হয়, যাদের মধ্যে ৪৫১ জনকে মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়া হয় এবং ১৭৩ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। শনিবার রাতে আরও ২৫৪ জনকে আটক করা হয়, যাদের মধ্যে ১৪৬ কিশোরকে মুচলেকায় পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়।
কোতোয়ালি মডেল থানার অভিযানে ৪৮ জন আটক
গতকাল রাতে কুমিল্লা নগরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪৮ জনকে আটক করেছে কোতোয়ালি মডেল থানার পুলিশ। তাঁদের মধ্যে অন্তত চারজন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য বলে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করেছে পুলিশ।
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন,
'নগরের যেসব এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা আড্ডা দেয় এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের চেষ্টা করে, সেসব এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে একজন আলোচিত একটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য এবং অপরজন অন্য একটি গ্যাংয়ের সদস্য বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে।'
রতন গ্রুপের 'সেকেন্ড ইন কমান্ড' আনিকসহ কারা আটক?
শনিবারের অভিযানে নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে কোতোয়ালি মডেল থানার পুলিশ ৩৭ জনকে আটক করেছিল। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলে জানিয়েছিল পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য, ওই পাঁচজনই নগরের আলোচিত 'রতন গ্রুপ' বা 'আর স্কোয়াডের' সক্রিয় সদস্য। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে আনিসুর রহমান ওরফে আনিক (১৯) ছিলেন। পুলিশ তাঁকে রতন গ্রুপের 'সেকেন্ড ইন কমান্ড' হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
আটকদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যাচাই শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উঠতি বয়সী কিশোরেরা যাতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য নিয়মিত এ ধরনের অভিযান চালানো হচ্ছে।
অপর ১০৮ জনের বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাং-সংক্রান্ত অপরাধ, মাদক ব্যবসা ও সেবন, নিয়মিত মামলা, ভ্রাম্যমাণ আদালত, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
কিশোর অপরাধ দমনে ধারাবাহিক অভিযান কেন জরুরি?
স্বাধীন বাংলাদেশের চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের প্রতিটি প্রান্তে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা আমাদের অগ্রাধিকার। কিশোর গ্যাংয়ের মতো সামাজিক ব্যাধি যুবসমাজকে বিপথে নিয়ে যেতে পারে, যা জাতির ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলে। ১৯৭১ সালের চেতনা আমাদের শেখায়, আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা এনেছি; সেই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে হলে সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল করতে হবে।
পুলিশের এই অভিযান কেবল আইন প্রয়োগের ঘটনা নয়, এটি একটি জাতীয় জাগরণের প্রতীক। কুমিল্লার মতো জেলায় যদি এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকে, তবে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো