স্বাধীনতার স্বপ্ন আর হিজাবের বিতর্ক: ইরানের সেই তুষার-দিনের স্মৃতি
আসিফ রহমান | মুক্তির বার্তা
১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি। ইরানের শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পতনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ রাজতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটে। বিপ্লবের বিজয় অনেকের কাছে ছিল গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায় এবং রাজনৈতিক মুক্তির নতুন সম্ভাবনা। কিন্তু সেই স্বপ্ন কতটা টেকসই ছিল, তা বুঝতে খুব বেশি সময় লাগেনি।
বিপ্লবের আনন্দের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর, ১৯৭৯ সালের ৭ মার্চ আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ঘোষণা দেন, সরকারি দপ্তরে কর্মরত নারীদের ইসলামি হিজাব পরিধান করতে হবে এবং জনপরিসরেও নারীদের পোশাক ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী হওয়া উচিত। এই ঘোষণাটি সংক্ষিপ্ত ছিল, কিন্তু এর রাজনৈতিক অভিঘাত ছিল সুদূরপ্রসারী।
অসংখ্য নারী উপলব্ধি করেন, যে বিপ্লবকে তাঁরা স্বাধীনতার স্বপ্ন বলে বিশ্বাস করেছিলেন, সেই বিপ্লবই হয়তো তাঁদের ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর নতুন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে যাচ্ছে।
প্রতিবাদের পাঁচ দিন
ঘোষণার পরদিন, আন্তর্জাতিক নারী দিবস, ৮ মার্চ। তেহরানের রাস্তায় নেমে আসেন হাজার হাজার নারী। সেই সমাবেশ পরদিন আরও বড় হয়, তারপর আরও বড়। ৮ থেকে ১২ মার্চ পর্যন্ত টানা পাঁচ দিন ধরে তেহরানের রাজপথ পরিণত হয় নারীর স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে এক বিরল গণ-আন্দোলনের মঞ্চে।
ইতিহাসবিদদের মতে, এই আন্দোলনে এক লাখের বেশি নারী অংশ নেন। তাঁদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন বহু পুরুষ, শিক্ষক, ছাত্র, শিল্পী, লেখক এবং মানবাধিকারকর্মী।
প্রতিবাদকারীদের দাবি
প্রতিবাদকারীদের দাবি ছিল খুবই স্পষ্ট — কেউ হিজাব পরবেন কি পরবেন না, সেই সিদ্ধান্ত রাষ্ট্র নেবে না; সিদ্ধান্ত নেবেন নারী নিজেই। পোশাককে ধর্মীয় আনুগত্যের মাপকাঠি বানানোর বিরুদ্ধেই তাঁরা কণ্ঠ তুলেছিলেন। এই আন্দোলন ছিল কেবল পোশাকের স্বাধীনতার জন্য নয়; এটি ছিল মানুষের শরীরের ওপর মানুষের নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।
হেঙ্গামেহ গোলেস্তানের ক্যামেরায় ইতিহাস
হেঙ্গামেহ গোলেস্তান এই আন্দোলনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন। তিনি দূর থেকে ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করেননি; বরং মানুষের ভেতরে দাঁড়িয়ে তাঁদের মুখ, কণ্ঠ, ভঙ্গি এবং সংকল্পকে ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন। তাঁর ছবিগুলো তাই সংবাদচিত্রের সীমা অতিক্রম করে ইতিহাসের প্রাথমিক উৎসে পরিণত হয়েছে।
ফ্রেমের ওপরের অংশজুড়ে খোলা ছাতাগুলোর এক অনন্য বিন্যাস চোখে পড়ে। কোথাও জ্যামিতিক নকশা, কোথাও ফুলের অলংকরণ, কোথাও আবার সরল একরঙা কাপড়। বিচিত্র এই ছাতাগুলো মিলে যেন প্রতিবাদী মানুষের মাথার ওপর একটি সামষ্টিক ছাউনি গড়ে তুলেছে। তারা কেবল তুষারের আঘাত থেকে আশ্রয় দিচ্ছে না; বরং ছবির ভিজ্যুয়াল গঠনে সৃষ্টি করছে এক পুনরাবৃত্ত ছন্দ, যা পুরো কম্পোজিশনকে একধরনের সংগীতময় গতি দিয়েছে।
ছাতার ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা নারীদের শরীরী ভাষাই ছবির প্রকৃত কেন্দ্র। অনেকের হাত মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় আকাশের দিকে উঁচিয়ে আছে। পৃথিবীর প্রায় সব গণ-আন্দোলনে এই ভঙ্গি প্রতিবাদের একটি সর্বজনীন প্রতীক। কোথাও মুখ খোলা। মনে হয়, তাঁরা স্লোগান দিচ্ছেন। কোথাও ঠোঁট শক্তভাবে চেপে ধরা। আবার কারও চোখ স্থির হয়ে আছে সামনের দিকে, যেন তিনি নিজের ভেতরেই কোনো দৃঢ় সিদ্ধান্ত বহন করছেন। প্রতিটি মুখ যেন আলাদা একটি গল্প, কিন্তু সব গল্প মিলেমিশে হয়ে উঠেছে এক সামষ্টিক উচ্চারণ।
পোশাকের ভাষা
পোশাকের দিকে তাকালেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে সময়ের পরিচয়। নারীদের পরনে সত্তরের দশকের শেষভাগের শহুরে ইরানের শীতকালীন পোশাক। দীর্ঘ কোট, মোটা উলের সোয়েটার, স্কার্ফ, কলারওয়ালা শার্ট, হাতে চামড়ার দস্তানা। এগুলো শুধু পোশাক নয়; এগুলো এক সমাজের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দলিল। এগুলো জানিয়ে দেয়, এই নারীরা এমন এক নগর-ইরানের প্রতিনিধি, যে সমাজ আধুনিক শিক্ষা, নাগরিক জীবন এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণার সঙ্গে পরিচিত।
অনাবৃত চুল আর তুষারের স্তর
কিন্তু ছবির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্যটি অন্যত্র। সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা নারীদের কারও মাথায় ইরানের ঐতিহ্যগত চাদর নেই, নেই কোনো ধর্মীয় আবরণ। তারা হিজাব করছে না, তাদের চুল খোলা। চুলের ওপর নীরবে জমে আছে সাদা তুষারের স্তর। প্রথম দর্শনে এটি নিছক একটি প্রাকৃতিক দৃশ্য মনে হতে পারে। কিন্তু ইতিহাস জানে, এই অনাবৃত চুলই কয়েক দিনের মধ্যে একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে কঠোর রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হবে। ফলে ছবিতে তুষার কেবল ঋতুর পরিচয় বহন করে না; তা হয়ে ওঠে আসন্ন রাজনৈতিক ঝড়েরও নীরব পূর্বাভাস।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও আমরা দেখেছি, কীভাবে ধর্মীয় আবরণ নিয়ে রাজনৈতিক অস্ত্র তৈরি করা হয়। আমাদের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ — সবই ছিল স্বাধীনতা, স্বায়ত্তশাসন এবং নিজের পরিচয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। ইরানের নারীদের সেই প্রতিবাদ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কখনোই একবার অর্জন করলেই শেষ হয় না; বরং প্রতিটি প্রজন্মকে নতুন করে তার জন্য লড়াই করতে হয়।
বাংলাদেশের নারীদের জন্যও এই ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের দেশেও ধর্মীয় পোশাক নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কেউ হিজাব পরবেন কি পরবেন না, সেটি কি রাষ্ট্র নির্ধারণ করবে, নাকি নারী নিজেই সিদ্ধান্ত নেবেন? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিজেদেরকেই খুঁজে বের করতে হবে।
প্রশ্নোত্তর
ইরানের নারী আন্দোলন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ইরানের নারী আন্দোলন শুধু পোশাকের স্বাধীনতার জন্য ছিল না; এটি ছিল মানুষের শরীরের ওপর মানুষের নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এই আন্দোলন দেখিয়ে দেয়, রাষ্ট্র কখনোই ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে না।
হেঙ্গামেহ গোলেস্তান কে?
হেঙ্গামেহ গোলেস্তান একজন ইরানি ফটোগ্রাফার, যিনি ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব এবং তার পরবর্তী নারী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন। তাঁর ছবিগুলো ইতিহাসের প্রাথমিক উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশের জন্য এই ইতিহাসের শিক্ষা কী?
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে, আমাদের বুঝতে হবে যে স্বাধীনতা মানে নিজের পরিচয় ও পছন্দের অধিকার। রাষ্ট্র কখনোই ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। নারীর পোশাকের সিদ্ধান্ত নেবেন নারী নিজেই, রাষ্ট্র নয়।