২৫ কোটি টাকার পলিনেট হাউস প্রকল্প: স্বাধীনতার ৫৪ বছরে কৃষকের স্বপ্নভঙ্গের করুণ কাহিনি
মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের কৃষক আজও স্বপ্ন দেখেন, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণে সরকারি প্রকল্পগুলো কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নতুন এক প্রকল্পে। রাজশাহী বিভাগের ১০২ জন চাষিকে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সারা বছর ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে 'পলিনেট হাউস' নির্মাণ করে দিয়েছিল কৃষি বিভাগ, যাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। তিন বছর পর দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ পলিনেট হাউসই অকেজো হয়ে পড়ে আছে, আর কৃষকদের বানিয়ে সাফল্যের গল্প বলতে হচ্ছে।
পলিনেট হাউস প্রকল্পের শুরুটা যেভাবে
২০২৩-২৪ অর্থবছরে 'আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন' শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ১০২টি পলিনেট হাউস নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। প্রতিটি হাউস তৈরি করতে গড়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৪ লাখ টাকা। প্রকল্পটি নিয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার, যার কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ।
পলিনেট হাউস হলো বিশেষ পলিথিন, নেট ও লোহার কাঠামো দিয়ে তৈরি এক ধরনের ঘর, যেখানে প্রতিকূল আবহাওয়া, পোকামাকড় ও রোগবালাই থেকে ফসল রক্ষা করে সারা বছর চাষাবাদ করা যায়। কৃষি কর্মকর্তাদের দাবি, এই ঘরে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও সেচের ব্যবস্থা রয়েছে।
কৃষকদের সাথে ২৫ বছরের চুক্তির শর্ত
যেসব চাষিকে পলিনেট হাউস দেওয়া হয়েছে, তাদের সবার সাথে ২৫ বছরের চুক্তি করেছে কৃষি বিভাগ। চুক্তির প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে পলিনেট হাউসের কোনো পরিবর্তন বা ধ্বংস করা যাবে না; কৃষক নিজ উদ্যোগে উচ্চমূল্যের ফসল চাষ করবেন; কোনো মৌসুমে এই হাউস ফেলে রাখা যাবে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হলে এক মাসের মধ্যে চাষিকেই মেরামত করতে হবে। শর্ত ভঙ্গ করলে নির্মাণ ব্যয় সাত দিনের মধ্যে সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হবে, নইলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পলিনেট হাউসে চাষযোগ্য ফসল ও প্রযুক্তি
এই পলিনেট হাউসে ক্যাপসিকাম, টমেটো, ব্রকলি, স্কোয়াশ, স্ট্রবেরি, মেলন, শসা, কপি, বাঁধাকপি, ব্রাসেলস স্প্রাউট, লেটুস ও চিনাশাক এবং গোলাপ, জারবেরা, রজনীগন্ধা ও গাঁদা ফুল চাষের কথা বলা হয়েছে। হাউসে 'মিক্সড ইরিগেশন সিস্টেম' রয়েছে, যার মাধ্যমে তাপমাত্রা কমানোর জন্য মিস্ট পদ্ধতিতে কুয়াশার মতো পানি ছিটানো যায় এবং ড্রিপ পদ্ধতিতে গাছের গোড়ায় ফোঁটায় ফোঁটায় পানি দেওয়া যায়।
সাফল্যের গল্প বানিয়ে বলতে বাধ্য করা হয়
দুই বছরের বেশি সময় পলিনেট হাউসগুলো পর্যবেক্ষণ করে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, হাউসের ৮০ শতাংশ এলাকায় চারা উৎপাদন হবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। নওগাঁর এক চাষি (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) প্রথম আলোকে জানান, প্রকল্প শুরুর এক বছর পর পাবনার হর্টিকালচার সেন্টারে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে সবাইকে বানিয়ে সফলতার গল্প বলতে বাধ্য করা হয়। চাষিরা যাতে সফলতার কথা বলেন, তা নজরদারির জন্য সেখানে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কড়া পাহারায় ছিলেন। কথায় কথায় একজন চাষি মুখ ফসকে সত্য কথা বলে ফেললে সবাই তাদের ব্যর্থতার গল্প ফাঁস করে দেন।
কৃষকদের অভিযোগ ও ক্ষতির হিসাব
পাবনার ঈশ্বরদীর বখতারপুর গ্রামের চাষি নজরুল ইসলাম বলেন, পলিনেট হাউসে চাষ না করে ওই জমি ইজারা দিলে বছরে এক লাখ টাকা পেতেন। রাজশাহীর পবা উপজেলার বড়গাছি গ্রামের মর্তুজা আহমেদের হাউসে পলিথিন ছিঁড়ে গেছে, কোনো ফসল করতে না পেরে তিনি হাউসের এক পাশে আঙুরের গাছ লাগিয়েছেন। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত এই হাউসে কোনো ফসল চাষ করে এক টাকাও লাভ করতে পারেননি; বরং ১০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।
নওগাঁর রানীনগরের চাষি মাসুদ রানা দাবি করেন, পলিনেট হাউস করে ১০ লাখ টাকা লোকসান গুনেছেন। যে মেকানিকেরা হাউস নির্মাণ করেছিলেন, তারা বলেছিলেন অন্তত ২০০ মাইক্রোনের পলিথিন দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বাস্তবে দেওয়া হয়েছে ১০০ মাইক্রোনের কম। নওগাঁ সদরের আরেক চাষি আব্দুল লতিফ বলেন, 'দুই নম্বর জিনিস দিয়ে এটা বানাইয়েছে। ছিঁড়ে যাচ্ছে। এখন শুধু দেখানোর জন্য আঙুর লাগিয়ে রেখেছেন, যাতে বলা যায় কিছু একটা হচ্ছে।'
কৃষি বিভাগের পাল্টা বক্তব্য
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক এস এম হাসানুজ্জামান বলেন, কৃষকেরা পরিশ্রম করতে চান না, তাদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন না, এ জন্যই সফল হয় না। তিনি বলেন, 'আমাদের চাষিরা সবাই অস্থির। কাউকে জোর করে পলিনেট হাউস দেওয়া হয়নি। আঙুরের জন্য এটা টেকসই একটা প্রযুক্তি।'
বিশেষজ্ঞদের মতামত
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মো. আহসানুল হক বলেন, শীতপ্রধান দেশে ঠান্ডার প্রকোপ থেকে ফসল রক্ষায় পলিনেট বা গ্রিনহাউসে চাষাবাদ স্বাভাবিক। তবে গ্রীষ্মপ্রধান বাংলাদেশে এ ধরনের হাউস করতে হলে ভেতরের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বায়ু চলাচল ফসলের উপযোগী রাখতে হয়। একেকটি ফসলের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকা দরকার। কিন্তু দেশের পলিনেট হাউসগুলোতে সব ফসলের জন্য প্রায় একই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যে কারণে প্রকল্পটি সফল হচ্ছে না।
স্বাধীন বাংলাদেশের কৃষকদের স্বপ্ন পূরণে করণীয়
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীন ভূখণ্ড, কিন্তু সেই স্বাধীনতার সুফল কি পৌঁছেছে আমাদের কৃষকদের কাছে? ২৫ কোটি টাকার প্রকল্প ব্যর্থ হলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, দেশের কৃষি উন্নয়নে গৃহীত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ও তদারকি কতটা সঠিক। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, মানসম্মত উপকরণ সরবরাহ এবং প্রকল্পের সঠিক মনিটরিং না হলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়া সম্ভব নয়। আমাদের কৃষকদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার মূল্যবোধ সার্থক হয়।