কাগুজে নোটের অর্ধেকই ৫০০-১০০০ টাকার, অর্থনীতির স্বাধীনতা কোথায়?
দেশের মানুষের হাতে ও ব্যাংকগুলোর ভল্টে থাকা কাগুজে নোটের প্রায় অর্ধেকই ৫০০ ও ১০০০ টাকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নিরীক্ষিত প্রতিবেদন বলছে, মোট নোটের ৪৯ শতাংশই এই দুই বড় মূল্যমানের। অথচ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে ওঠা এই দেশের অর্থনীতি আজ কোথায় দাঁড়িয়ে, তা ভাবার সময় এসেছে।
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও আমরা কি সত্যিই অর্থনৈতিক মুক্তি পেয়েছি? নাকি বড় নোটের আধিপত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় মূল্যস্ফীতির সেই কঠিন বাস্তবতা, যেখানে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে?
বাজারে কতটি নোট চলছে?
গত জুন শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক ও মানুষের হাতে মোট ৯৬৬ কোটি ৫৪ লাখ ৮২ হাজার ৪১৮টি কাগুজে নোট ছিল। এসব নোটের বাজারমূল্য প্রায় ৩ লাখ ৬৮ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ১০০০ ও ৫০০ টাকার নোট।
সংখ্যার দিক থেকে বাজারে সবচেয়ে বেশি ৫০০ টাকার নোট। বর্তমানে প্রায় ২৭০ কোটি ৫০০ টাকার নোট চলছে, যার আর্থিক মূল্য ১ লাখ ৩৪ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। আর্থিক মূল্যমানে শীর্ষে ১০০০ টাকার নোট। জুন শেষে ১০০০ টাকার নোট ছিল প্রায় ২০৩ কোটি ৭৮ লাখ ৮৫ হাজার, যার মোট মূল্য প্রায় ২ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।
কেন কমছে ছোট নোটের সংখ্যা?
বাজারে সবচেয়ে কম নোট ২০০ টাকার। জুনের হিসাবে ২০০ টাকার নোট ছিল মাত্র ৫২ কোটি ৮৯ লাখ ২ হাজার ৩৪৯টি, যার মূল্য প্রায় ১০ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা। এর চেয়ে দ্বিগুণ ১০০ টাকার নোট, সংখ্যায় প্রায় ১১৭ কোটি ১৮ লাখ ৮৬ হাজার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, ছোট নোটের মধ্যে ২০ ও ১০০ টাকার নোট কাগজের অভাবে চাহিদা অনুযায়ী ছাপানো যায়নি। ১০ টাকার নোট বেশি হাতবদলের কারণে দ্রুত ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে যায়। আর নতুন নোট আসতে সময় লাগে।
আমরা চাইছি, মানুষ নগদ লেনদেনের বদলে ডিজিটাল লেনদেন বেশি করুক। এ জন্য বাংলা কিউআর কোডও চালু করা হয়েছে। ডিজিটাল লেনদেন বাড়লে নোট ছাপানোর খরচও কমে আসবে।
মূল্যস্ফীতি কি বড় নোটের চাহিদা বাড়িয়েছে?
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি। পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় কেনাকাটায় বড় নোটের প্রয়োজন বাড়ছে। যেমন এক কেজির বেশি ব্রয়লার মুরগি কিনতেই এখন ২০০ টাকার বেশি লাগে।
এ ছাড়া ব্যাংকের এটিএম বুথে শুধু ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট রাখা হয়। বড় অঙ্কের লেনদেন বা ক্যাশ উত্তোলনেও এই দুই নোটের ব্যবহার বেশি।
১০, ২০, ৫০ টাকার নোটের অবস্থা কী?
বর্তমানে ১, ২ ও ৫ টাকার কাগজের নোট বাজারে প্রায় নেই। ধাতব মুদ্রাও মানুষ পকেটে বহন করতে চায় না। ফলে প্রথম কার্যকর কাগজের নোট ১০ টাকার। রিকশাভাড়া, চা-নাস্তার দোকান, বাসভাড়ার মতো ক্ষুদ্র লেনদেনে ১০ টাকার নোটের হাতবদল সবচেয়ে বেশি।
বাজারে ১০ টাকার নোট প্রায় ১৫০ কোটি, ২০ টাকার প্রায় ৯৪ কোটি আর ৫০ টাকার ৭৯ কোটির বেশি। তবে আর্থিক মূল্যমানে এসব নোটের অবদান কম। ১০, ২০ ও ৫০ টাকার মোট ৩২৩ কোটি নোটের সম্মিলিত মূল্য মাত্র ৭ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা।
নোটের বিপরীতে জামানত কী আছে?
বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ, ১৯৭২-এর ৩০ ধারা অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে যত টাকার নোট ছাড়বে, তার সমপরিমাণ আর্থিক মূল্যের ভৌত ও আর্থিক সম্পদ জামানত হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে।
বর্তমানে ৩ লাখ ৬৮ হাজার ২৮৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকার কাগুজে নোটের বিপরীতে সমপরিমাণ সম্পদ সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা, ২ লাখ ৯৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, যা মোট জামানতের ৮১ শতাংশ।
দ্বিতীয় বৃহত্তম অংশ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড, ৪৫ হাজার ৯৯৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এ ছাড়া ২১ হাজার ৭৩৪ কোটি ১১ লাখ টাকার সোনা ও ১২১ কোটি ৮৮ লাখ টাকার রুপা রয়েছে। স্বল্পমেয়াদি ঋণের ব্যাকআপ প্রায় ২ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা এবং ধাতব মুদ্রা ৪৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পথে করণীয়
১৯৭১ সালে আমরা অর্জন করেছিলাম রাজনৈতিক স্বাধীনতা। কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তি এখনও অধরা। বড় নোটের আধিপত্য, মূল্যস্ফীতি আর ছোট নোটের সংকট প্রমাণ করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এখনও সঙ্কটে।
ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার ভালো উদ্যোগ, তবে তা যেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বাদ না দেয়। দেশের অর্থনীতিকে সত্যিকারের স্বাধীন করতে হলে ছোট নোটের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে। তবেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে ওঠা বাংলাদেশ সত্যিকারের সার্বভৌম অর্থনীতির পথে এগিয়ে যাবে।