বাঁধনের ওপর হামলা: নীরবতা কি সত্যিই আমাদের রক্ষা করবে?
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশি চলচ্চিত্র 'দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড'-এর প্রচারণায় অংশ নিতে গিয়ে ইতালিতে অভিনয়শিল্পী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর যে ন্যক্কারজনক হামলা ঘটেছে, তা শুধু একজন শিল্পীর ওপর আক্রমণ নয়। এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এবং নারীমুক্তির সংগ্রামের ওপর একইসঙ্গে আঘাত। ১৯৭১ সালে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম, সেই স্বাধীনতার মর্মবাণী আজ যেন কিছু মানুষের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়েছে।
যাঁরা এই হামলার বিরুদ্ধে এখনো নীরব, তাঁদের উদ্দেশে বলতে চাই, 'নীরবতা আপনাকে রক্ষা করবে না।' এই উক্তিটি কবি অদ্রি লর্ডের, কিন্তু এর সত্যতা আমরা আমাদের নিজেদের ইতিহাস থেকেই জানি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে আমরা নীরব থাকিনি বলেই আজ বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। ১৯৭১ সালে আমরা নীরব থাকিনি বলেই আজ আমাদের নিজস্ব পতাকা আছে।
ভেনিসে বাংলাদেশের গৌরব, আর সেই গৌরবকে ঘিরে লজ্জা
মর্যাদাপূর্ণ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হওয়া বাংলাদেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র 'দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড' (২০২৬)। রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুবাদে বাঁধন ও তাঁর সহশিল্পীরা বর্তমানে ইতালি ভ্রমণ করছেন। এটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য একটি ঐতিহাসিক অর্জন, যা আমাদের সংস্কৃতির বৈশ্বিক স্বীকৃতির পথ খুলে দিচ্ছে।
চলচ্চিত্রটির সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, ঢাকায় জেইনিন নামের এক নারী বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে, কিন্তু তার শরীর নানা অপ্রত্যাশিতভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়। প্রথাগত সৌন্দর্য ও সামাজিক প্রত্যাশার চাপে বিয়ের প্রস্তুতিরত এক নারীর শরীরের প্রতিরোধের যাত্রা ঘিরে চলচ্চিত্রটি আবর্তিত হয়েছে। একজন নারীকে সমাজ যেসব ক্যাটাগরি দ্বারা সংজ্ঞায়িত করতে চায়, চলচ্চিত্রটি নিশ্চয় সেসবের একটি সিনেম্যাটিক ক্রিটিক হাজির করেছে।
কাকতালীয় হলেও সত্য, বাঁধনের ওপর হামলাটি যেন চলচ্চিত্রটিকে পর্দার দুনিয়া থেকে বাস্তবের দুনিয়ায় নিয়ে এল। নারী শরীরের ওপর ঐতিহাসিকভাবে যে নিপীড়ন চলছে, সে বিষয়ে নীরবতা কার স্বার্থে? উত্তরটি সহজ, পুঁজিবাদী পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামোর স্বার্থে। যাঁরা বাঁধনের ওপর হামলার ব্যাপারে এখনো নীরব, তাঁরা মূলত সেই ক্ষমতার পূজারি, সে আপনি যে পরিচয়েরই হোন না কেন। কারণ আপনার নীরবতাই এই নিপীড়নের পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করছে।
বঙ্গবন্ধুর সৈনিকদের মুখোশ খুলে যায়
সামাজিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি ভিডিও মারফত জানা যায়, 'জয় বাংলা' বলতে বাঁধনকে বাধ্য করছিল 'বঙ্গবন্ধুর সৈনিক' শিরোনামে কয়েকজন বাংলাদেশি প্রবাসী পুরুষ। তখন বাঁধনের সঙ্গে তার পরিবার ছিল, শিশু কোলে। ভয়ে শিশুটি কান্না করছিল, তবু বঙ্গবন্ধুর সৈনিকেরা তাদের নিপীড়ন থামাতে নারাজ।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট গভীর রাতে নিষ্পাপ শিশু শেখ রাসেলকে হত্যা আজও আমাদের ব্যথিত করে। অথচ যাঁরা নিজেদের 'বঙ্গবন্ধুর সৈনিক' বলে দাবি করেন, তাঁরা আজ শিশুটির সামনে যা করে দেখাল, তা ঐতিহাসিকভাবে শেখ মুজিবুর রহমান পরিবারকে আরও কয়েক দফা খুন করল যেন। মনে রাখবেন, ইতিহাস শিশু নিপীড়নকারীদের কখনো শাস্তি থেকে রেহাই দেয়নি। এই সত্য দুই হাজার বছর পূর্বের গ্রিস নগরী থেকে বর্তমানের ফিলিস্তিনের গাজা নগরী পর্যন্ত প্রমাণিত। অতএব অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা আপনাকে রক্ষা করবে না।
নীরবতা কি ফ্যাসিস্টের ভাষা?
শ্রেণিসমাজের শোষণের অন্যতম হাতিয়ার ভয়ের সংস্কৃতি ও স্বার্থের লোভ দিয়ে মুখ বন্ধ করে রাখা, যাতে প্রজন্মান্তরে আপনাকে এবং আপনার চিন্তাকে বন্দী করে রাখা যায়, অন্ধ করে রাখা যায়, বধির করে রাখা যায়। কিন্তু নিপীড়িত মানুষ মুখ বন্ধ রাখে না, তাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতেই হয়।
ইতিহাসের পাতা খুললে আমরা দেখতে পাই, আধুনিক ও ঔপনিবেশিক ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ প্রথম সেন্সরশিপ আইন চালু করতে বাধ্য হয়েছিল দীনবন্ধু মিত্রের 'নীল দর্পণ' (১৮৬০) নাটকের মঞ্চায়ন রুখতে, নিপীড়িত মানুষের প্রতিবাদের ভাষার টুঁটি চেপে ধরতে। অধুনা বাংলাদেশ এখনো সেই কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক আইনের পরাকাষ্ঠা পার হতে পারেনি। তবু কালে কালে অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা ভেঙে সেই আন্তিগোনে থেকে হালের বাঁধনেরা কথা বলে চলেছেন। নিপীড়িত মানুষ কথা বলবেই, কেননা মানুষ ভাষার প্রাণী এবং 'নীরবতাই ফ্যাসিস্টের ভাষা'।
কেন বাঁধন এই হামলার শিকার হলেন?
প্রথমত, বাঁধন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে স্বৈরাচারী হাসিনা রেজিমের সব অন্যায় ও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, বাঁধন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে সংঘটিত মব জাস্টিস শিরোনামে ভিন্নমতের ওপর হামলা, মানবাধিকার হরণ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তৃতীয়ত, বাঁধন মহান মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতি, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধিতা ও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপের মধ্য দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে বিশ্বাস করেন।
শেষতক এবং সবচেয়ে জরুরিভাবে, বাঁধন পিতৃতান্ত্রিক সমাজের তৈরি করে দেওয়া 'নারী' পরিচয়কে লাথি মেরে ভেঙে দিতে চান এবং চিৎকার করে বলতে চান, 'নীরবতা আপনাকে রক্ষা করবে না'।
আমাদের করণীয় কী?
এই হামলার বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে সরব হতে হবে। সামাজিক গণমাধ্যমে প্রতিবাদ জানাতে হবে, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ঘটনার নিন্দা জানাতে হবে। ১৯৭১ সালের চেতনা আমাদের শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেই হবে। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, প্রতিটি আন্দোলনেই আমরা প্রমাণ করেছি, আমরা নীরব থাকি না।
বাঁধনের পাশে দাঁড়ানো মানে শুধু একজন শিল্পীর পাশে দাঁড়ানো নয়, এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, নারীমুক্তি এবং গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নেওয়া। নীরবতা নয়, আমাদের জবাব হতে হবে সোচ্চার প্রতিবাদ। কারণ, ইতিহাস সাক্ষী, নীরবতা কখনো অন্যায়কে থামাতে পারেনি, পারেনি নিপীড়িতকে রক্ষা করতে।
নীরবতা আপনাকে রক্ষা করবে না।