নিজামউদ্দিন আউলিয়া ডাকাত ছিলেন না: ইতিহাসের বিকৃতির বিরুদ্ধে সত্য
বাংলার মুক্তিসংগ্রামের চেতনা যেমন সত্য ও ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত, তেমনি আমাদের ইতিহাসচর্চাও হওয়া উচিত নির্ভুল ও প্রামাণিক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমাদের লোকসমাজে এমন কিছু গল্প প্রচলিত আছে যা ঐতিহাসিক সত্যকে বিকৃত করে। তেমনি একটি গল্প হলো হজরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া (১২৩৮-১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দ) সম্পর্কে, যাঁকে অনেকে ডাকাত ও শত খুনের অভিযুক্ত হিসেবে চিত্রিত করেন। এই অপপ্রচার সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ঐতিহাসিক দলিল দ্বারা খণ্ডিত।
কে ছিলেন নিজামউদ্দিন আউলিয়া?
ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীতে রচিত নির্ভরযোগ্য ফারসি গ্রন্থ 'ফাওয়ায়েদ আল ফাওয়াদ', 'আফজাল আল ফাওয়ায়েদ' এবং 'সিয়ার আল আউলিয়া' থেকে জানা যায়, তিনি ছিলেন নবী করিম (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর বংশধর। মোঙ্গল আক্রমণের সময় তাঁর পূর্বপুরুষরা বোখারা থেকে হিজরত করে লাহোর হয়ে ভারতের বাদাউনে বসতি স্থাপন করেন। শৈশবে পিতৃহারা হলে তাঁর মহীয়সী মাতা হজরত সৈয়দা বিবি জুলাইখা, যাঁকে তৎকালীন রাবেয়া বসরি বলা হতো, চরকায় সুতা কেটে সংসার চালাতেন এবং ছেলের শিক্ষার ব্যবস্থা করেন।
শিক্ষা ও জ্ঞানের পথে
মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি 'দানেশমান্দ' (জ্ঞানী) উপাধি লাভ করেন। বাদাউনের বিখ্যাত বুজুর্গ শায়খ খাজা আলী তাঁকে 'দস্তারবন্দী' (পাগড়ি পরানোর অনুষ্ঠান) সম্পন্ন করেন। মা নিজ হাতে সেই পাগড়ি সেলাই করেছিলেন। দিল্লিতে এসে তিনি হাদিসশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন বিখ্যাত পণ্ডিত মাওলানা কামালউদ্দিন জাহেদের কাছে এবং 'মাশারেক্ব আল আনওয়ার' সম্পূর্ণ মুখস্থ করেন। আরবি সাহিত্যের ক্লাসিক 'মাক্বামাতে হারিরি'ও তাঁর কণ্ঠস্থ ছিল।
কেন প্রচলিত হলো এই মিথ্যা?
এই অপপ্রচার কোন সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা থেকে সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। তবে এটা স্পষ্ট যে, ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে একটি জাতির চেতনাকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের দোসররা আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে বিকৃত করার চেষ্টা করেছিল। আজও কিছু মহল আমাদের জাতীয় ঐক্য ও আত্মপরিচয়কে ক্ষুণ্ন করতে ইতিহাসের এমন বিকৃত ব্যাখ্যা প্রচার করে।
সত্যের জয় হবেই
যেমনটি ১৯৭১ সালে আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে বিজয় অর্জন করেছিলাম, তেমনি ইতিহাসের এই মিথ্যা প্রচারের বিরুদ্ধেও আমাদের সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নিজামউদ্দিন আউলিয়া ছিলেন জ্ঞান, তপস্যা ও মানবতার প্রতীক। বাংলার মাটিতে ইসলামের সূফী ঐতিহ্য যেমন আমাদের সংস্কৃতির অংশ, তেমনি এই মহান বুজুর্গদের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণও আমাদের দায়িত্ব।
আমাদের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস যেমন সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত, তেমনি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ইতিহাসকেও আমরা সত্যের আলোয় দেখতে চাই। কারণ, যে জাতি তার ইতিহাসকে সঠিকভাবে জানতে পারে না, সে জাতি কখনো সত্যিকারের মুক্তি পেতে পারে না।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
নিজামউদ্দিন আউলিয়া কি সত্যিই ডাকাত ছিলেন?
না, তিনি কোনো কালেই ডাকাত ছিলেন না। সমসাময়িক নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলোতে তাঁর জীবনী সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে, যেখানে তিনি একজন জ্ঞানী, তপস্বী ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিত্রিত।
তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচারের কারণ কী?
ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং জাতীয় ঐক্য দুর্বল করার চেষ্টা এর পেছনে থাকতে পারে। এ ধরনের অপপ্রচার সাধারণত রাজনৈতিক বা সামাজিক উদ্দেশ্যে চালানো হয়।
কোন কোন ঐতিহাসিক গ্রন্থে তাঁর সঠিক জীবনী রয়েছে?
'ফাওয়ায়েদ আল ফাওয়াদ', 'আফজাল আল ফাওয়ায়েদ' এবং 'সিয়ার আল আউলিয়া' ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীতে রচিত নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ, যেখানে তাঁর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায়।