উম্মে আবদুল্লাহ: আয়েশা সিদ্দিকার (রা.) সেই চিরন্তন পরিচয়
আমাদের ইতিহাস-চেতনা ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের গভীরে যে আত্মপরিচয়ের সন্ধান মেলে, তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো উম্মুল মুমিনিন আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)-এর 'উম্মে আবদুল্লাহ' উপাধি। স্বাধীন বাংলাদেশের চেতনা যেমন আমাদের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির ওপর প্রতিষ্ঠিত, তেমনি ইসলামের ইতিহাসের এই শিক্ষাও আমাদের পারিবারিক বন্ধন ও সম্মানের চিরন্তন রীতি তুলে ধরে।
সন্তান না থাকা সত্ত্বেও কেন 'উম্মে আবদুল্লাহ'?
প্রশ্নটি অনেকের মনেই জাগে, আয়েশা সিদ্দিকার (রা.) তো নিজের কোনো সন্তান ছিল না, তাহলে তাঁকে 'আবদুল্লাহর মা' বলা হয় কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে স্বয়ং আয়েশা (রা.)-এর বর্ণিত একটি সহিহ হাদিসে।
একদিন তিনি নবীজির (সা.) দরবারে আবেদন করলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমার সব সখীদেরই পরিবারিক নাম (কুনিয়াত) আছে।' জবাবে নবীজি (সা.) বললেন, 'তুমি তোমার (বোনের) ছেলে আবদুল্লাহর নামে কুনিয়াত গ্রহণ করো।' (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৭০)
বর্ণনাকারী মুসাদ্দাদ এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এখানে আবদুল্লাহ বলতে আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইরকে বোঝানো হয়েছে। এর পর থেকেই আয়েশা সিদ্দিকার কুনিয়াত হয়ে যায় উম্মে আবদুল্লাহ।
আরব সমাজে কুনিয়াত ছিল সম্মানের প্রতীক
ঘটনার সূচনাটিও অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী। আয়েশা (রা.) দেখলেন, তাঁর সতীনদের প্রত্যেকেরই একটি করে কুনিয়াত রয়েছে। তাঁরও ইচ্ছা হলো, নিজের এমন একটি সুন্দর পরিচয় থাকুক। তাই তিনি রাসুলুল্লাহর (সা.) কাছে বিষয়টি তুলে ধরলেন।
এতে বোঝা যায়, আরব সমাজে কুনিয়াত শুধু নামের বিকল্প কোনো সম্বোধন ছিল না, এটি ছিল পরিচয় ও সম্মানের একটি স্বাভাবিক রীতি। নবীজিও (সা.) তাঁর এ ইচ্ছাকে উপেক্ষা করেননি। বরং এমন একজনের সঙ্গে কুনিয়াত যুক্ত করলেন, যাঁর সঙ্গে ছিল ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সম্পর্ক।
খালার স্নেহে গড়া এক মাতৃত্বের সম্পর্ক
'উম্ম' অর্থ মা। সাধারণত কারও কুনিয়াত 'উম্মে অমুক' হলে ধারণা করা হয়, অমুক তাঁর সন্তান। আয়েশা সিদ্দিকার (রা.) ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল ব্যতিক্রম। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইরের মা ছিলেন না, ছিলেন তাঁর খালা।
আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবি ও ইসলামের ইতিহাসের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর বাবা জুবাইর ইবনে আওয়াম এবং মা আয়েশা সিদ্দিকার বড় বোন আসমা বিনতে আবু বকর।
খালার সঙ্গে ভাগনের সম্পর্ক আরব সমাজে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল। আয়েশা সিদ্দিকার (রা.) ক্ষেত্রে সেই সম্পর্ক আরও মর্যাদাপূর্ণ; কারণ, তিনি ছিলেন নবীজির স্ত্রী আর ভাগনে ছিলেন সাহাবায়ে কেরামের সম্মানিত পরিবারের সন্তান। অর্থাৎ এখানে মাতৃত্বের সম্পর্কটি আত্মীয়তা ও ভালোবাসার, জন্মসূত্রের নয়।
কুনিয়াতের শিক্ষা: সন্তান না থাকলেও মা হওয়া যায়
এই ঘটনা কুনিয়াত সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। তা হলো, কুনিয়াত গ্রহণের জন্য নিজের সন্তান থাকা আবশ্যক নয়। উপযুক্ত সম্পর্ক, ভালোবাসা কিংবা সম্মান প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেও কুনিয়াত হতে পারে।
ঘটনার আরেকটি দিকও লক্ষণীয়। আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) একটি ব্যক্তিগত ইচ্ছা প্রকাশ করলেন, আর নবীজি (সা.) সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে তাঁর জন্য একটি সুন্দর কুনিয়াত নির্ধারণ করে দিলেন। এতে নবীজির পারিবারিক জীবনের কোমলতা ও আপনজনদের অনুভূতির প্রতি মনোযোগ দেওয়ার সুন্দর দৃষ্টান্ত ফুটে ওঠে।
মৃত্যু পর্যন্ত 'উম্মে আবদুল্লাহ' নামেই পরিচিতি
আরও বিস্ময়কর হলো, এই কুনিয়াত পরবর্তীকালে আয়েশা সিদ্দিকার (রা.) পরিচয়ের স্থায়ী অংশ হয়ে যায়। মুসনাদে আহমদের একটি বর্ণনায় এসেছে, তাঁকে মৃত্যুর আগপর্যন্ত 'উম্মে আবদুল্লাহ' বলা হতো। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২৬২৪২)
ইতিহাসের পাতায় আয়েশা সিদ্দিকাকে (রা.) আমরা মূলত দেখি জ্ঞানী সাহাবি, ফকিহ, হাদিসের অন্যতম প্রধান বর্ণনাকারী এবং নবীজির ঘরোয়া জীবনের বিশ্বস্ত সাক্ষী হিসেবে। কিন্তু 'উম্মে আবদুল্লাহ' নামটি তাঁর জীবনের আরেকটি কোমল অধ্যায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। সেখানে নিজের সন্তান জন্ম দেওয়ার দাবি নেই, আছে একজন প্রিয় ভাগনের প্রতি স্নেহের সম্পর্ক। আছে নবীজির দেওয়া একটি পরিচয়ের স্মৃতি।
সন্তান না থাকলেও একজন নারী 'উম্মে' নামে পরিচিত হতে পারেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগের এই ঘটনা তারই সুন্দর ও প্রামাণ্য দৃষ্টান্ত। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মতোই, এই শিক্ষাও প্রমাণ করে যে, ভালোবাসা ও আত্মীয়তার বন্ধনই সবচেয়ে বড় পরিচয় গড়ে তোলে।