সুচন্দার সাক্ষাৎকার: জহির রায়হান সিঁড়ির অর্ধেক পর্যন্ত নেমে আবার উঠে এলেন, এরপর সেই যে বেরিয়ে গেলেন, আর ফিরলেন না
আসিফ রহমান | মুক্তির বার্তা
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন অনেক স্মৃতি আছে যা আমাদের স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান। তাঁর জীবন ও কর্ম আমাদের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। সম্প্রতি প্রখ্যাত অভিনেত্রী সুচন্দা এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, কীভাবে তিনি চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন এবং সেই পথে জহির রায়হানের ভূমিকা কী ছিল।
সুচন্দা বলেন, ‘আমার বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু কাজী খালেক সাহেব ছিলেন একজন পরিচালক-প্রযোজক। একদিন তিনি আমাকে দেখে বলেন, “তোমার মেয়ে তো ভারি সুন্দর দেখতে।” তিনি আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করেন, মেয়েকে নায়িকা হিসেবে চলচ্চিত্রে দেওয়া হবে কিনা। আমার বাবা প্রথমে রাজি হননি। কিন্তু কাজী খালেক সাহেব জোর দিয়ে বলেন, “তোমার মেয়েকে ক্যামেরায় দেখাই না, ছবিতে দিতে হবে না।” শেষ পর্যন্ত আমার বাবা রাজি হন।’
সুচন্দা আরও জানান, ‘একদিন কাজী খালেক সাহেবের একটি ডকুমেন্টারি শর্ট ফিল্মের শুটিং ছিল। সেখানে আমাকে ডায়ালগ দেওয়া হয় এবং একটি গানও ছিল। আমি অভিনয় করি। তারপর সেটা ভুলে গেছি। পড়াশোনা চলছে, জীবন চলছে।’
কিন্তু তারপর একদিন ঘটে এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। সুচন্দা বলেন, ‘একদিন বাসায় কল বেল বাজল। আমি দরজা খুলে দেখি, একজন পাতলা ছিপছিপে ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। তিনি আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করেন। আমি বলি, বাবা বাসায় নেই। তখন তিনি পকেট থেকে একটি চিরকুট বের করে বলেন, “এই কাগজ তোমার বাবাকে দিও।” আমি বললাম, “আচ্ছা।” তিনি চলে গেলেন। আমি জানতাম না, সেই চিরকুটের মধ্যে কী ছিল।’
সুচন্দা বলেন, ‘তারপর অনেক দিন পার হলো। একদিন আমার মা আমাকে বলেন, “তুমি রেডি হও। একটা শাড়ি বের করে দিলেন।” শাড়িটা ছিল লাল-কালো ডোরা ডোরা সুতির শাড়ি। আমি জিজ্ঞেস করি, “কেন মা?” মা বলেন, “তোমার আব্বার সঙ্গে তুমি এক জায়গায় যাবে। যেখানে যাবে, তাকে তুমি চেনো।” আমি বলি, “আমি চিনি?” মা বলেন, “তুমি তাঁর ছবি দেখেছ। ওনার নাম সুভাষ দত্ত।” আমি তখন ভাবছিলাম, কোন ছবি দেখেছি আমি?’
সুচন্দা বলেন, ‘ওনার বাসায় গেলাম। দরজা বেল দিতেই একজন লোক এসে খুললেন। আমরা বারান্দায় দেখলাম একটি বড় চেয়ার, তার সামনে টেবিল, টেবিলের এপাশে অনেকগুলো চেয়ার। বড় চেয়ারটা দেখেই বুঝতে পারলাম, এটাতে নিশ্চয় উনিই বসেন। আমি ভাবছিলাম, ওনাকে দেখে বোধ হয় আমি হেসে ফেলব।’
এই স্মৃতিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস কতটা গভীর ও বৈচিত্র্যময়। জহির রায়হানের মতো মহান ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্ম আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। তাঁর স্মৃতি আমাদের স্বাধীনতা ও সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা স্মরণ করিয়ে দেয়।
ছবি: প্রথম আলো
সুচন্দার চলচ্চিত্রে আগমনের পেছনে কার ভূমিকা ছিল?
সুচন্দার চলচ্চিত্রে আগমনের পেছনে মূল ভূমিকা ছিল তাঁর বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু কাজী খালেক সাহেবের। তিনি সুচন্দার বাবাকে রাজি করান তাঁর মেয়েকে ক্যামেরায় দেখানোর জন্য। পরে সুভাষ দত্তের মাধ্যমে সুচন্দার চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ ঘটে।
জহির রায়হানের সঙ্গে সুচন্দার কী সম্পর্ক ছিল?
সুচন্দার সাক্ষাৎকারে জহির রায়হানের সরাসরি উল্লেখ নেই। তবে তাঁর স্মৃতিচারণে চলচ্চিত্র জগতের সেই সময়ের পরিবেশ ও ব্যক্তিত্বদের কথা উঠে এসেছে। জহির রায়হান ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি ১৯৭১ সালে শহীদ হন।
সুচন্দার স্মৃতিচারণ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সুচন্দার স্মৃতিচারণ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি আমাদের জানায়, কীভাবে একসময় চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশের পথ ছিল সহজ ও স্বাভাবিক। এছাড়া এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী শহীদ হয়েছেন, যাদের মধ্যে জহির রায়হান অন্যতম।