প্রয়াণের ৫০ বছর পরেও বিদ্রোহী কবি নজরুল কেন আজও আমাদের জাগিয়ে তোলেন
১৯৭৬ সালের ২৭ আগস্ট ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। প্রয়াণের ৫০ বছর পরেও সেই বিদ্রোহী কলম, সেই কণ্ঠের আগুন যেন আজও আমাদের সমাজের সামনে একই প্রশ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে। কেন সময় পেরিয়েও এতটা প্রাসঙ্গিক তিনি? শোষণ, বঞ্চনা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর সেই আপসহীন অবস্থান কি আজকের বাংলাদেশের জন্যও কোনো শিক্ষা বহন করে?
নজরুলের জন্ম, সংগ্রাম ও অমর সৃষ্টির পথপরিক্রমা
১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া নজরুল অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলা সাহিত্যজগতে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেন। কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, সাংবাদিকতা, সৃষ্টিশীলতার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর। 'বিদ্রোহী', 'সাম্যবাদী', 'অগ্নিবীণা', 'দোলনচাঁপা'র মতো সৃষ্টি বাংলা সাহিত্য ও সমাজচিন্তায় এনেছিল নতুন চেতনার জোয়ার।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে নজরুলের আপসহীন অবস্থান
অন্যায়, শোষণ, বঞ্চনা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে নজরুল ছিলেন এক আপসহীন কণ্ঠস্বর। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর লেখা যেমন প্রতিবাদের শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল, তেমনই সাম্প্রদায়িকতা ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধেও ছিল তাঁর স্পষ্ট অবস্থান। শ্রমজীবী ও নিপীড়িত মানুষের কথা বারবার উঠে এসেছে তাঁর সাহিত্যে। নারীর অধিকার, ধর্মীয় সংকীর্ণতা এবং মানুষে মানুষে বিভেদের বিরুদ্ধেও তিনি ছিলেন সোচ্চার। তাই নজরুল শুধু 'বিদ্রোহী কবি' নন, তিনি সত্যিকার অর্থেই মানুষের কবি।
ধর্ম ও বর্ণের গণ্ডির ঊর্ধ্বে মানুষের কবি
ধর্ম ও বর্ণের গণ্ডির ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষের পরিচয়েই দেখেছিলেন নজরুল। তাঁর সৃষ্টিতে যেমন ইসলামী ঐতিহ্য ও কোরআনের ভাবধারা রয়েছে, তেমনই রয়েছে শ্যামাসংগীত, ভক্তিগীতি ও হিন্দু পুরাণের নানা অনুষঙ্গ। এই অসাম্প্রদায়িক চেতনাই তাঁকে বাংলা সংস্কৃতিতে সম্প্রীতির অন্যতম বড় প্রতীকে পরিণত করেছে। সংগীতের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অনন্য। শাস্ত্রীয় সংগীতের রাগরাগিণীকে বাংলা গানের সঙ্গে মিলিয়ে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন এক স্বতন্ত্র সংগীতধারা, যা আজ 'নজরুলসংগীত' নামে বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সাংবাদিক নজরুল: কলমের জন্য জেল, কণ্ঠে বিদ্রোহ
শুধু সাহিত্য ও সংগীতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি নজরুল। সাংবাদিক হিসেবেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। 'ধূমকেতু', 'লাঙল'-সহ বিভিন্ন পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থেকে নিজের রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তাভাবনা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর লেখার কারণে ব্রিটিশ সরকারের রোষানলে পড়তে হয়েছিল তাঁকে, কারাবরণও করতে হয়েছিল। কিন্তু কারাগারও তাঁর প্রতিবাদী কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে পারেনি। ১৯৩৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'ধ্রুব' চলচ্চিত্রের যৌথ পরিচালনার পাশাপাশি অভিনয়, গান রচনা, সুরারোপ ও সংগীত পরিচালনাতেও নিজের বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন।
দীর্ঘ নীরবতা আর অমর সৃষ্টির উত্তরাধিকার
জীবনের শেষ অধ্যায় অবশ্য কেটেছিল দীর্ঘ নীরবতায়। ১৯৪২ সালে অসুস্থ হওয়ার পর ধীরে ধীরে বাকশক্তি ও স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। জীবনের প্রায় ৩৪ বছর কাটে অসুস্থ ও নীরব অবস্থায়। কিন্তু থেমে থাকেনি তাঁর সৃষ্টি, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর কবিতা, গান ও সাহিত্যকর্ম।
প্রয়াণের ৫০ বছর পরেও নজরুল কেন এত প্রাসঙ্গিক?
প্রয়াণের পাঁচ দশক পরেও তাই নজরুলের প্রশ্নগুলো আজও সমান প্রাসঙ্গিক। শোষণ ও বঞ্চনা কেন থাকবে, মানুষে মানুষে বিভেদ কেন থাকবে, স্বাধীনতার অর্থই বা কতটা পূর্ণ? ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের যে আদর্শ আমাদের পথ দেখায়, নজরুলের সেই বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর যেন তারই এক উজ্জ্বল প্রতীক।
নজরুলকে স্মরণ করার সবচেয়ে বড় উপায় শুধু তাঁর জন্ম বা মৃত্যুদিন পালন নয়; বরং তাঁর সাহিত্য, সংগীত ও দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, ধর্মীয় সম্প্রীতি, সাম্য ও মুক্তির যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, সেই আদর্শকে জীবনে ধারণ করার মধ্যেই নিহিত থাকবে বিদ্রোহী কবির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা। আজকের বাংলাদেশ যখন নিজের পরিচয় ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে দৃঢ়, তখন নজরুলের সেই অসাম্প্রদায়িক, মানবতাবাদী ও স্বাধীনতাপ্রিয় চেতনাই হোক আমাদের পাথেয়।