যাদবপুরে সপ্তাহ পেরিয়েও বিচারহীনতা: প্রতীক-ফলক ভাঙার অভিযোগে অধ্যাপক রাজ্যেশ্বরের বিরুদ্ধে মামলা
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিরাগত হামলার ঘটনা পেরিয়ে গেছে সাতটি দিন। অথচ অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ বা প্রশাসন। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হলেও কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন হলেও কাজ শুরু করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে বৃহস্পতিবার কমিটির প্রথম বৈঠক যথাসময়ে হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তারা।
এই প্রেক্ষাপটে বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই অধ্যাপকের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে এবিভিপি। বাংলার অধ্যাপক রাজ্যেশ্বর সিংহের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক-ফলক ভাঙার ঘটনায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এবিভিপি-র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শুভব্রত অধিকারী জানিয়েছেন, প্রতীক-ফলক ভাঙার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে লেখা দেশবিরোধী স্লোগান নিয়েও তারা পদক্ষেপ চাইছেন। তাঁদের দাবি, জুটা-র সভাপতি অধ্যাপক পার্থপ্রতিম রায় ও সাধারণ সম্পাদক রাজ্যেশ্বর সিংহের মদতেই রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান লেখা হয়েছে। তাই এই দুই অধ্যাপকের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়েছে এবিভিপি।
কীভাবে শুরু হয়েছিল সংঘর্ষ?
গত বুধবার রাত ৮টা নাগাদ ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ডাকা পড়ুয়াদের সাধারণসভাকে ঘিরে গোলমাল শুরু হয়। অভিযোগ, সেখানে এবিভিপি-র কর্মী সমর্থকদের মারধর করা হয়। স্থানীয় হাসপাতালে যেতে হয় যাদবপুর শাখার এবিভিপি-র সভাপতি নিখিল দাস-সহ কয়েকজনকে। এরপরই যাদবপুরের বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায় ক্যাম্পাসে এসে সংবাদমাধ্যমকে জানান, অভিযুক্তরা থানায় আত্মসমর্পণ না করলে 'তাণ্ডব' চলবে।
গভীর রাতে সত্যিই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হামলা চালায় বহিরাগতেরা। ভাঙচুর চালানো হয়, পতাকা ছিঁড়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বাম সংগঠনের সদস্য পড়ুয়াদের তাড়া করে অরবিন্দ ভবনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। সে সময় রক্ষী ওই ভবনের দরজা বন্ধ করে দেন। বাইরে থেকে জ্বলন্ত পতাকা ভিতরে ছুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ। এমনকি ছাত্রাবাসেও হামলা চালানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিসি ক্যামেরায় দেখা গেছে, রাত ১২টা ৩৮ মিনিটে ক্যাম্পাসের ৪ নম্বর গেট দিয়ে একদল বহিরাগত ঢোকেন।
প্রতীক-ফলক ভাঙার ঘটনায় কে দায়ী?
পরদিন বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ফের উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। একদিকে বাম ছাত্র সংগঠন, অন্যদিকে এবিভিপি-র সদস্যেরা মিছিল করেন। দুপুরের পর ফের উত্তেজনা বাড়ে ৪ নম্বর গেটে। ফটক বন্ধ থাকলেও বহিরাগতেরা ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। না পেরে বাইরে থেকে ছোড়া হয় বোতল, ডিম ইত্যাদি। চলতে থাকে স্লোগান। বহিরাগতদের হাতে এবিভিপি-র পতাকা ছিল বলে অভিযোগ। এমনকি ৪ নম্বর গেটের গায়ে লাগানো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক-ফলকের উপর পা দিয়ে উঠে দাঁড়ান কেউ কেউ। এক সময় ওই ফলক থেকে বৃত্তাকার ধাতব অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে তা-ও ছুড়ে দেওয়া হয় ক্যাম্পাসের ভিতরে।
নতুন করে শুরু হয় অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকা বাম ছাত্রসংগঠনের দাবি, ওই প্রতীক-ফলক ভেঙেছেন এবিভিপি-র সদস্যেরা। অন্যদিকে এবিভিপি দাবি করে, বামেরা ফলক ভেঙে তাদের নামে দোষারোপ করছে।
অধ্যাপকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী?
এরই মধ্যে অভিযোগ উঠতে থাকে গণিতের অধ্যাপক ও প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য বুদ্ধদেব সাউয়ের বিরুদ্ধে। তিনি দক্ষিণপন্থী শিক্ষক সংগঠন অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘের সদস্য। বাম পড়ুয়াদের তরফে দাবি করা হয়, সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে বহিরাগত হামলার রাতে বুদ্ধদেব ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়েছিলেন এবং বেশ কয়েকজন এবিভিপি সদস্যের সঙ্গে কথা বলেছেন। যদিও সে রাতে ক্যাম্পাসে তাদের কোনো সদস্য ঢোকেননি বলে দাবি করে এবিভিপি। আবার প্রতীক-ফলক ভাঙার ঘটনায় বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রাজ্যেশ্বর সিংহের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে।
তদন্ত কমিটি নিয়ে জটিলতা
বহিরাগত হামলার প্রায় ৩৭ ঘণ্টা পর গত শুক্রবার থানায় লিখিত অভিযোগ জানান কর্তৃপক্ষ। গঠন করা হয় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। চেয়ারম্যান করা হয় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য শুভশঙ্কর সরকারকে। কিন্তু তাঁকে নিয়ে আপত্তি তোলে এবিভিপি। পরে শারীরিক কারণ দেখিয়ে সরে দাঁড়ান শুভশঙ্কর। এরপর সরে দাঁড়ান প্রস্তাবিত কমিটির আর এক সদস্য বাবা সাহেব আম্বেডকর এডুকেশন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অরুণাশিস গোস্বামী।
মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সেলিমবক্স মণ্ডলের সঙ্গে দেখা করে পুলিশ। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ নেওয়া হয়। পরে আসে কলকাতা পুলিশের ফরেনসিক দল। ঘটনাস্থল খতিয়ে দেখে তারা।
এরই মধ্যে মুখ খোলেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। গোটা ঘটনার নিন্দা করে তিনি শান্তি বজায় রাখার আবেদন জানিয়েছেন।
অন্যদিকে পড়ুয়াদের একাংশ জানিয়েছেন, প্রশাসনের উপর তাঁদের ভরসা নেই। কিন্তু তদন্তের তথ্য-প্রমাণ লোপাট বা বিকৃত যাতে না করা হয়, সে কারণে তদন্ত কমিটিতে ছাত্রপ্রতিনিধি রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহনকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে যাদবপুরের এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াই কেবল একদিনের নয়। প্রতিটি প্রজন্মকে সজাগ থাকতে হয়, যাতে কোনো শক্তি আমাদের সংস্কৃতি ও ভাষার উপর আঘাত না আনতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক-ফলক ভাঙা নিছক একটি ধাতব চিহ্ন ধ্বংস করা নয়, এটি একটি সভ্যতার প্রতীককে অপমান করার শামিল।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক-ফলক ভাঙার ঘটনায় কাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছে?
বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রাজ্যেশ্বর সিংহের বিরুদ্ধে প্রতীক-ফলক ভাঙার ঘটনায় এবিভিপি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে। এছাড়া জুটা-র সভাপতি অধ্যাপক পার্থপ্রতিম রায়ের বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান লেখার অভিযোগ আনা হয়েছে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটির বর্তমান অবস্থা কী?
তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও চেয়ারম্যান শুভশঙ্কর সরকার শারীরিক কারণ দেখিয়ে সরে দাঁড়িয়েছেন। আরেক সদস্য অরুণাশিস গোস্বামীও সরে দাঁড়িয়েছেন। বৃহস্পতিবার কমিটির প্রথম বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
বহিরাগত হামলার ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করা হয়েছে কি?
এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে এবং ফরেনসিক দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।