দ্বৈত নাগরিকত্ব বনাম সাংবিধানিক পদ: মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রশ্ন ওঠে কেন?
১৯৭১-এর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা অর্জন করেছি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের শেখায়, দেশের প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসা যেন কোনো কিছুর চেয়ে কম না হয়। কিন্তু সম্প্রতি সরকারের মন্ত্রিসভায় রদবদলের পর দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্নে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আমাদের সংবিধানের চোখে দেখলে স্পষ্ট হয় যে, সাংবিধানিক পদে থাকতে হলে দেশের প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য কতটা জরুরি।
প্রশ্নটা কোথা থেকে এলো?
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভায় রদবদল করেছে। এতে চারজন মন্ত্রী ও দুইজন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। যাদের মধ্যে একজন হচ্ছেন হুমায়ুন কবির। এর আগে তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। কিন্তু প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরই তার বিদেশি নাগরিকত্ব আছে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে আসে।
সংবিধান কী বলছে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন, তবে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারবেন না। অন্যদিকে ৫৬ ধারায় বলা আছে, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী হতে হলে তাঁদের সংখ্যার অন্তত নয়-দশমাংশ সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে নিতে হবে। বাকি এক-দশমাংশ এমন ব্যক্তিদের থেকে নেওয়া যাবে, যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য। অর্থাৎ, সংসদ সদস্য হওয়ার যে যোগ্যতা, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রেও প্রায় একই যোগ্যতা প্রযোজ্য।
উপদেষ্টা কেন পারেন, মন্ত্রী কেন পারেন না?
সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার পদটি সাংবিধানিক নয়। তাই উপদেষ্টা থাকাকালীন দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্ন ওঠেনি। কিন্তু মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী সাংবিধানিক পদ। তাই দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে সেই পদে থাকা যায় না। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি অন্য দেশের নাগরিক হলে তিনি এমপি, মন্ত্রী বা অন্য কোনো সাংবিধানিক পদে যেতে পারবেন না।
দ্বৈত নাগরিকত্বের শপথ ও গোপনীয়তার প্রশ্ন
সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাংবিধানিক পদে শপথ নেওয়ার সময় দুই ধরনের শপথ নিতে হয়। একটি পদের শপথ, আরেকটি গোপনীয়তার শপথ। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে গোপনীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকে। কারো যদি দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকে, তাহলে তার পক্ষে সেই গোপনীয়তা রক্ষা করা দুরূহ হয়ে পড়তে পারে। উপদেষ্টা পদের ক্ষেত্রে এই শপথের প্রয়োজন হয় না, তাই সেখানে এই বাধা নেই।
বিএনপির নিজের অবস্থানও কি বদলায়নি?
মজার ব্যাপার হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় খলিলুর রহমানের দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি সামনে এনে তাঁর পদত্যাগের দাবি করেছিল বিএনপি। কিন্তু চলতি বছরের ১৭ই ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর খলিলুর রহমানকেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে দেখা যায়। তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন না, তাই টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হয়েছেন। এখন প্রশ্ন হলো, যে নীতি বিএনপি অন্যদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করেছিল, নিজেদের ক্ষেত্রে তা মানছে কি না।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমাদের করণীয়
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের শেখায়, দেশের স্বার্থই সবার উপরে। যারা দেশের সাংবিধানিক পদে থাকবেন, তাঁদের দেশের প্রতি আনুগত্য যেন কোনো প্রশ্নের মুখে না পড়ে। দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্নে সংবিধান যতটা স্পষ্ট, ততটা স্পষ্ট হওয়া উচিত আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানও। কারণ, একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব শুধু সংবিধান মেনে চলা নয়, সংবিধানের চেতনাকে ধারণ করাও।
“যে কোন সাংবিধানিক পদে যখন শপথ হয় তখন দুই ধরনের শপথ দেওয়া হয়। একটা পদের শপথ নেয়, আরেকটা গোপনীয়তার শপথ নেয়। অর্থাৎ তিনি যে পদে দায়িত্ব পালন করবেন সেই পদে কী কী করছেন তার গোপনীয়তা রক্ষা করা।” - শাহদীন মালিক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ
দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে কি বাংলাদেশে মন্ত্রী হওয়া যায়?
না, বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ ও ৫৬ ধারা অনুযায়ী দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা সংসদ সদস্য হওয়া যায় না। সাংবিধানিক পদে থাকতে হলে অন্য দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা কি সাংবিধানিক পদ?
না, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সাংবিধানিক পদ নয়। তাই দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলেও কেউ উপদেষ্টা হতে পারেন। কিন্তু মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হতে গেলে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হয়।
দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে কি আবার সাংবিধানিক পদে যাওয়া যায়?
হ্যাঁ, কেউ যদি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় অন্য দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন, তাহলে তিনি সাংবিধানিক পদে যাওয়ার যোগ্য হবেন। তবে সেটি হতে হবে আইনানুযায়ী।
সবশেষে
আমাদের সংবিধান স্পষ্টভাবে বলছে, দেশের সাংবিধানিক পদে থাকতে হলে দেশের প্রতি আনুগত্য থাকতে হবে। দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্নে যেন কোনো রাজনৈতিক দল নিজেদের স্বার্থে সংবিধানের ব্যাখ্যা না বদলায়, সেদিকে আমাদের সবার নজর রাখা উচিত। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সংবিধানের মূলনীতি আমাদের পথ দেখাবে।