অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের টাকা আটকে বঞ্চনার প্রতিবাদে রাজ্যজুড়ে মহিলাদের তাণ্ডব
পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলায় 'অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার' প্রকল্পের প্রাপ্য টাকা না পাওয়ার অভিযোগে তীব্র জনরোষ ছড়িয়ে পড়েছে। আবেদন মঞ্জুর হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা না ঢোকায় রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে বঞ্চনা ও প্রশাসনিক চরম গাফিলতির অভিযোগ তুলে আন্দোলনে নেমেছেন হাজার হাজার মহিলা। ফারাক্কা, সাগরদিঘি, ধুলিয়ান থেকে শুরু করে উত্তর ২৪ পরগনার বিরাটি এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজপুর-সোনারপুর-সহ রাজ্যের একাধিক অংশে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি।
ফারাক্কা বিডিও অফিসে তুমুল উত্তেজনা, সার্ভেতে 'স্বজনপোষণে'র অভিযোগ
মুর্শিদাবাদের ফারাক্কা বিডিও অফিস চত্বরে শুক্রবার সকাল থেকেই প্রচুর গ্রামবাসী মহিলা ভিড় জমায়। বিক্ষোভকারীদের মূল অভিযোগ, 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' প্রকল্পে প্রতি মাসে ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকা সরাসরি অ্যাকাউন্টে এলেও অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারে যোগ্য ও দরিদ্র মহিলারা সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি সার্ভেতে চরম গাফিলতি রয়েছে। ৪ চাকা, ১২ চাকা ও ১৪ চাকার বিলাসবহুল গাড়ির মালিকদের নাম তালিকায় স্থান পেলেও প্রকৃত দুঃস্থ পরিবারগুলো কাঁদছে।
বিক্ষোভকারী মহিলাদের অভিযোগ, প্রশাসনিক ভুল সার্ভের কারণেই এই বৈষম্য তৈরি হয়েছে। ক্ষুব্ধ মহিলারা নিজেদের উদ্যোগেই এলাকাভিত্তিক সমীক্ষা চালিয়ে ধনী-দরিদ্রের সঠিক তালিকা তৈরি করে বিডিও-র কাছে জমা দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে ফারাক্কার বিডিও সুজয় ব্যাপারী নিজে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। শেষ পর্যন্ত ফারাক্কা থানার বিপুল পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সাগরদিঘিতে বিডিও অফিসের দরবারে আবেদনকারীদের দীর্ঘ লাইন
একই ছবি দেখা গেছে মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘি ব্লক সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিকের অফিসে। সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও বকেয়া টাকা অ্যাকাউন্টে না পৌঁছানোয় দুপুর ১২টা নাগাদ ক্ষুব্ধ মহিলারা বিডিও অফিস ঘেরাও করে প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। দীর্ঘক্ষণ দরবার করেও কোনো প্রশাসনিক সমাধান বা সঠিক উত্তর না মেলায় তৈরি হয় তীব্র উত্তেজনা। বকেয়া টাকা মেটানো এবং পুনরায় কাগজপত্র জমা দেওয়ার আশায় দপ্তর চত্বরে আবেদনকারীদের দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে।
ধুলিয়ান পুরসভায় বিক্ষোভ, সামসেরগঞ্জ থানার পুলিশ মোতায়েন
ধুলিয়ান পুরসভা ভবনের সামনেও বঞ্চনার বিরুদ্ধে মহিলারা দফায় দফায় সরব হন। অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের টাকা কেন হঠাৎ আটকে গেল, সে বিষয়ে পুর কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা না মেলায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। খবর পেয়ে সামসেরগঞ্জ থানার পুলিশ বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা চালায়। তবে অবিলম্বে সমাধান না হলে আন্দোলন আরো বড় আকার নেবে বলে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন।
বিরাটিতে রেল অবরোধ, বিপর্যস্ত শিয়ালদহ-হাসনাবাদ শাখায় ট্রেন চলাচল
প্রশাসনিক দপ্তরের পাশাপাশি এই প্রতিবাদের আঁচ গিয়ে পড়ে রেল পরিষেবাতেও। উত্তর ২৪ পরগনার বিরাটি স্টেশনের কাছে ফ্লাইওভারের নিচে ট্র্যাকের ওপর বসে পড়ে বিক্ষোভ দেখান শতাধিক মহিলা উপভোক্তা। হাসনাবাদ-শিয়ালদহ ডাউন লোকাল অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় ব্যস্ত সময়ে শিয়ালদহগামী ট্রেন চলাচল পুরোপুরি থমকে যায়। প্রায় আধঘণ্টা ধরে চলে এই অবরোধ। শেষ পর্যন্ত রেল পুলিশের আশ্বাসে ও মধ্যস্থতায় অবরোধ উঠে গেলেও চূড়ান্ত হয়রানির শিকার হন নিত্যযাত্রীরা।
রাজপুর-সোনারপুর পুরসভায় আইসি-র নেতৃত্বে বিশাল পুলিশ বাহিনী
অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজপুর-সোনারপুর পুরসভা চত্বরে। টানা তিন মাস ধরে অ্যাকাউন্টে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ভাতা না আসায় ক্ষুব্ধ মহিলারা পুরসভার চেয়ারম্যানের ঘরের সামনে অবস্থান বিক্ষোভ দেখান। পরিস্থিতি সামাল দিতে সোনারপুর থানার আইসি-র নেতৃত্বে বিশাল পুলিশ বাহিনী গিয়ে পৌঁছায়।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই মানবিক অধিকার। আজকের এই মহিলারা সেই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েই প্রশাসনিক গাফিলতির বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছেন। তাঁদের এই প্রতিবাদ শুধু একটি প্রকল্পের টাকা পাওয়ার লড়াই নয়, এটি ন্যায়বিচার ও স্বাধীন ভাবনারই প্রকাশ। বাংলাদেশের মতো পশ্চিমবঙ্গেও সাধারণ মানুষের এই আন্দোলন প্রমাণ করে, জনগণ জাগ্রত হলে কোনো শক্তিই তাদের দাবি আটকাতে পারে না।