চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষা কার্যক্রম টানা ১৩ দিনের শাটডাউনে পুরোপুরি বন্ধ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার মূল্যবোধ যেখানে লালিত, সেই শিক্ষাঙ্গনে আজ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়েছে। নতুন উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই সংকটে শিক্ষার্থীরা সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের পুনর্বহালের দাবিতে অটল, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
শাটডাউনে কী অবস্থা চুয়েটের?
গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি বিভাগের পরীক্ষা স্থগিত হয়ে গেছে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বন্ধ। শিক্ষাপঞ্জি পিছিয়ে যাচ্ছে দিন দিন। শিক্ষার্থীরা বলছে, প্রতিদিন তাদের পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে এবং সামনে শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গতকাল রোববারও শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপাচার্য ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। শনিবার ছুটির দিনেও শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেছে। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তারা। কিন্তু নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারেননি।
উপাচার্য পরিবর্তন কেন বিতর্কের কেন্দ্রে?
গত ২৭ জুলাই চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। মাত্র ৫৬ দিন দায়িত্ব পালনের পর ২১ সেপ্টেম্বর তাকে অব্যাহতি দিয়ে কুয়েটের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এই আকস্মিক পরিবর্তনই ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অধ্যাপক সায়েম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতেন এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের সুবাদে উচ্চশিক্ষা ও চাকরির সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. আবুল হাসান বলেছেন, অল্প সময়ে কাজের সুযোগ না দিয়ে হঠাৎ তাকে সরানো অপমানজনক।
অনেকে মনে করছেন, এই পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষক জানান, একজন প্রতিমন্ত্রী তার পছন্দের কাউকে উপাচার্য করতে চেয়েছিলেন। তবে এই অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ ও ভবিষ্যৎ
পুরকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নাফিস হাসান বলেছেন, ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় প্রতিদিন তাদের ক্ষতি হচ্ছে। তবু উপাচার্য পুনর্বহালের দাবি থেকে সরতে রাজি নন তারা।
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম জানিয়েছেন, শিক্ষাপঞ্জির এই বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। প্রতিটি ব্যাচের চূড়ান্ত পরীক্ষার পর কিছুদিন ছুটি থাকে, সেই সময়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে পিছিয়ে পড়া কাজ পুষিয়ে নেওয়া যাবে।
সমাধানে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?
সংকট নিরসনে শিক্ষকদের সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ হচ্ছে। বিভাগীয় কমিশনার ও প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনের পক্ষ থেকে আলোচনার আহ্বান এসেছিল, কিন্তু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন স্থগিতের শর্তে তারা সাড়া দেননি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে এখনো দৃশ্যমান নতুন কোনো উদ্যোগ নেই। নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম বলেছেন, তিনি অনলাইনে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।
জাতীয় স্বার্থে দ্রুত সমাধান জরুরি
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শিক্ষিত প্রজন্মের ভূমিকা অপরিসীম। চুয়েটের মতো প্রকৌশল শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে দীর্ঘদিন শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকা দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়। শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ জানিয়েছেন, অতীতে সংকটের পর বাড়তি ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া হয়েছে। ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ সালের দুটি ব্যাচের শিক্ষা কার্যক্রম একসঙ্গে চালানো হয়েছিল।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসে শিক্ষাঙ্গন সবসময় জাতীয় চেতনার প্রাণকেন্দ্র। এই সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি দেশের প্রকৌশল খাতেও এর প্রভাব পড়বে। জাতীয় স্বার্থে সরকারের উচিত দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে এই অচলাবস্থা নিরসন করা।
চুয়েটের ইতিহাস ও ঐতিহ্য
১৯৬৮ সালে প্রকৌশল কলেজ হিসেবে চুয়েটের যাত্রা শুরু। পরে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (বিআইটি) হয়। ২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে ১৮টি বিভাগে ৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য দেশের প্রকৌশল শিক্ষার অগ্রগতির সঙ্গে জড়িত।
চুয়েটের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো উপাচার্যকে ফিরিয়ে আনতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে আন্দোলন করছে। নজিরবিহীন এই বিরোধ দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ।