ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে ২ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ: স্বাধীনতার চেতনায় নতুন প্রজন্মের প্রতিবাদ
ফ্রান্সের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই মানবিক অধিকার। আজ সেই চেতনাই যেন ইউরোপের বুকে ফ্রান্সের শিক্ষার্থীরা ধারণ করেছে। অর্থসংকট, জরাজীর্ণ অবকাঠামো আর শিক্ষক সংকটের বিরুদ্ধে ফ্রান্সজুড়ে দুই হাজারেরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা।
কেন ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভ?
ফ্রান্সের শিক্ষার্থী ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলো অর্থসংকটে থাকা সরকারের কাছে বিদ্যালয়ের সমস্যা সমাধানের দাবি জানাচ্ছে। কর্মীর ঘাটতি, জরাজীর্ণ অবকাঠামো, আর শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়ায় ক্ষোভ চরমে উঠেছে। দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল প্যারিসের সুবিধাবঞ্চিত শহরতলিতে, পরে তা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।
সংঘর্ষ আর ধরপাকড়ের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদ
বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, প্যারিসসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ হয়েছে। ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রায় ৯০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্লাস স্থগিত করেছে। তবে ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ইউনিয়নের দাবি, দেশজুড়ে প্রায় দুই হাজার মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। সরকার দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করে ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়েছে। লিয়োঁসহ কিছু জায়গায় পুলিশের ব্যারিকেডে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
সরকারের ওপর চাপ আরও বেড়েছে
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, আজ দেশজুড়ে ৮৬ হাজার প্রতিবাদকারী রাস্তায় নেমেছে। প্যারিসে বিক্ষোভে ২০ থেকে ৪০ হাজার মানুষ অংশ নিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই অস্থিরতা সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়েছে, বিশেষ করে যখন সরকার ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করছে। ছয় মাস পরই প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর উত্তরসূরি বেছে নিতে নির্বাচন। গত কয়েক দিনে ফ্রান্সের ঋণের খরচ বেড়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা চলতি শতকের শুরুতে দেখা যায়নি।
শিক্ষামন্ত্রীর আহ্বান: শিক্ষার্থীদের মতামত চাওয়া হলো
শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দো জেফ্রে উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের একটি অনলাইন মতামত গ্রহণ কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, 'উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা, এবার তোমাদের বলার পালা। তোমাদের প্রতিটি বিদ্যালয়ের সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা আমাদের জানাও।' এই কার্যক্রম চলবে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত।
১৯৯০-এর দশকের আন্দোলনের স্মৃতি
বাড়তি অর্থ বরাদ্দের দাবিতে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের এত বড় দেশব্যাপী আন্দোলন সর্বশেষ হয়েছিল ১৯৯০-এর দশকে। পল ভালেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্লেমেন্স কার্দোঁ-কাঁ বলেন, তখন সরকার ব্যাকালরিয়া পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ বাড়িয়েছিল, কিন্তু বিদ্যালয়গুলোকে যথেষ্ট সম্পদ দেয়নি। ওই আন্দোলনের ফলে বরাদ্দ বেড়েছিল, কিন্তু পরে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় আর বাড়েনি।
মেরিন লঁ পেনের রাজনৈতিক প্রস্তাব
ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মেরিন লঁ পেন সরকারি ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজেটে ফ্রান্সের নিট চাঁদা ৫০০ কোটি ইউরোতে নামাতে চান। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ওপর কর বসানোর কথাও বলেছেন তিনি। লঁ পেন মনে করেন, ফ্রান্স ঋণসংকটের দ্বারপ্রান্তে। ২০২৭ সালের নির্বাচনে 'ভুল সিদ্ধান্ত' নিলে দেশটি ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ: বাস্তব চিত্র
শিক্ষা খাতে বাজেট ১ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৬ হাজার ৫৫৩ কোটি ইউরো হতে যাচ্ছে। তবে এই বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) সদস্যদেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের অবস্থান মাঝামাঝি। ২০১০ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় ছিল ১১ হাজার ৯১০ ইউরো, ২০২৪ সালে তা দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৬৬০ ইউরোতে।
ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ থেকে আমাদের শিক্ষা
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের শেখায়, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। ফ্রান্সের শিক্ষার্থীরা আজ সেই মেরুদণ্ড সোজা রাখার লড়াইয়ে নেমেছে। ১৯৭১ সালে আমরা যেমন ভাষা ও স্বাধীনতার জন্য লড়েছিলাম, আজ ফ্রান্সের তরুণ প্রজন্ম মানসম্মত শিক্ষার জন্য লড়ছে। এই প্রতিবাদ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষার অধিকার কোনো দেশের সীমানা মানে না, এটি সর্বজনীন মানবাধিকার।