প্যারিসের উপকণ্ঠ ক্রাতেইয়ের একটি হাইস্কুলের শিক্ষক-সংকটকে কেন্দ্র করে গত ২১ সেপ্টেম্বর যে ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ জ্বলেছিল, তা আজ গোটা ফ্রান্সে দাবানলের রূপ নিয়েছে। মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে এই আন্দোলন দেশটির ইতিহাসে এক অনন্য প্রতিরোধে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও আমাদের ১৯৭১-এর চেতনা আজও প্রাসঙ্গিক, কারণ প্রতিটি জাতিই তার তরুণদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিতে শেখে, আর ফ্রান্সের এই কিশোর-কিশোরীরা ঠিক সেই শিক্ষাই দিচ্ছে।
কীভাবে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল এই আন্দোলন?
৫ অক্টোবর বিক্ষোভ তৃতীয় সপ্তাহে পা রাখার পর সহিংসতা ও উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। সোমবার শুধু প্যারিস অঞ্চলেই অন্তত ১৬০টি হাইস্কুল (মোট স্কুলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ) বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয় স্থানীয় প্রশাসন। দেশটির শিক্ষামন্ত্রী এদ্রিয়াঁ গেফ্রে জানান, বিক্ষোভের মুখে দেশজুড়ে ৪০০-৫০০টি স্কুলের পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবারের মধ্যে ফ্রান্সের মোট ৩ হাজার ৬০০টি হাইস্কুলের প্রায় ৩০ শতাংশই ধর্মঘটের কবলে পড়ে। রাজধানী, উপশহর, বড় শহর এমনকি ছোট মফস্সল শহরগুলোতেও হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাজপথে নেমেছে। শিক্ষকদের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন এসএনইএস-এফএসইউ-এর প্রধান সোফি ভেনেতিতে আক্ষেপ করে বলেন,
‘আমরা এক ঐতিহাসিক ছাত্র বিক্ষোভের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। সরকারের পক্ষে এই সংকট কাটানো মোটেও সহজ হবে না।’
১৯৭১-এর মতোই স্বতঃস্ফূর্ত এই প্রতিরোধ
কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্ব বা উসকানি ছাড়াই একেবারে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর ভর করে এই আন্দোলনের জন্ম। ঐতিহ্যগতভাবে ফ্রান্সে যেকোনো ছাত্র আন্দোলন প্যারিস শহর থেকে শুরু হলেও এবার শুরু হয়েছে অবহেলিত উপশহরগুলো থেকে।
২০২৬ সালের এই আন্দোলনের সঙ্গে ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক হাইস্কুল আন্দোলনের দারুণ মিল রয়েছে। সে বছরও নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মাথায় প্যারিসের উপশহরগুলো থেকে ক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল। তৎকালীন ও বর্তমান, উভয় আন্দোলনই রাজপথে নেমেছে শিক্ষার্থীদের নিত্যদিনের তীব্র ক্ষোভ ও অবহেলার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে, যা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে চমকে দিয়েছে।
তরুণদের দাবিগুলো কী?
স্কুলের সামনের প্রতিটি ব্যারিকেডে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীরা এখন উচ্চকণ্ঠে আওয়াজ তুলছে। তাদের দাবি স্পষ্ট:
- স্কুলে তীব্র শিক্ষক-সংকট দূর করা
- অনুপস্থিত শিক্ষকদের জায়গায় বিকল্প শিক্ষকের ব্যবস্থা
- একেকটি ক্লাসে ৩৫ জনের ওপর শিক্ষার্থী কমানো
- বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বিতর্কিত কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘পারকুরসাপ’ বিলুপ্তি
- জরাজীর্ণ স্কুল ভবন সংস্কার
এই প্রতিবাদের পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর সামাজিক উদ্বেগ, সুযোগের সমতা রক্ষা করা। ফ্রান্সের মতো দেশে যেখানে পারিবারিক, সামাজিক ও আর্থিক ব্যাকগ্রাউন্ড শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে, সেখানে সরকারি ব্যবস্থার এই অবক্ষয় তরুণদের তীব্র ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
মাখোঁর ১০ বছরের শিক্ষানীতির ফলাফল
বর্তমান হাইস্কুল শিক্ষার্থীরা জন্ম নিয়েছিল ২০১০ সালের দিকে, যে সময়টায় ফ্রান্সে শিশু জন্মের হার শীর্ষে ছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর দুই মেয়াদের শাসনামলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে হাজার হাজার শিক্ষক পদ বিলুপ্ত করা হয়। ফলে ২০০৮ সালের তুলনায় বর্তমানে সরকারি স্কুলে শিক্ষক সংখ্যা মারাত্মক কমেছে, অথচ শিক্ষার্থী বেড়েছে আড়াই লাখের বেশি।
শিক্ষকদের একটি ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক এলিজাবেথ আলাঁ-মোরেঁনো খোলামেলাই বললেন,
‘মাখোঁর ১০ বছরের শিক্ষানীতির পর এই শিক্ষার্থীরা যে রাজপথে নামবে, তা অত্যন্ত স্বাভাবিক। বরং অবাক হওয়ার বিষয়, তারা এত দিন সহ্য করল কীভাবে!’
স্কুল ভবন ও পারকুরসাপের আতঙ্ক
ফরাসি স্কুল ভবনগুলোর অবস্থাও শোচনীয়। গড়ে একটি হাইস্কুল ভবনের বয়স ৬১ বছর এবং কারিগরি স্কুল ভবনের বয়স প্রায় ৭১ বছর। ২০১৫ সালের পর মাত্র ১৫ শতাংশ ভবন সংস্কার বা নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে চরম তাপপ্রবাহ বা ‘হিটওয়েভ’-এর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা এসব পুরোনো ভবনে নেই। আন্দোলনের প্ল্যাকার্ডেও ফুটে উঠেছে সেই ক্ষোভ, ‘৪০ ডিগ্রি তাপপ্রবাহে কীভাবে পরীক্ষার হলে বসব?’
অন্যদিকে, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির অনলাইন পোর্টাল ‘পারকুরসাপ’ শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট মনতেইন’-এর ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৭৭ শতাংশ শিক্ষার্থী এই প্ল্যাটফর্মের কারণে তীব্র মানসিক চাপ ও উৎকণ্ঠায় ভোগে।
সরকারের কৌশল ও পুলিশের দমন
সমাজবিজ্ঞানী অলিভিয়ার গালঁ বলেন,
‘কিশোরদের মধ্যে একধরনের গভীর মানসিক হতাশা কাজ করছে। নিজের স্কুলে আগুন দেওয়া বা ভাঙচুর করা নিশ্চয়ই কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; এটি একটি শক্তিশালী প্রতীকী প্রতিবাদ।’
রাজনীতির মাঠেও এই ক্ষোভ সরকারের জন্য এক মস্ত বড় গলার কাঁটা। কারণ, এটি নির্দিষ্ট কোনো আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন নয় যে সরকার আইনটি প্রত্যাহার করে নিলেই পরিস্থিতি ঠান্ডা হয়ে যাবে। আন্দোলনের বিরুদ্ধে পুলিশের অভূতপূর্ব ও নির্দয় শক্ত অবস্থানও উদ্বেগজনক। আন্দোলনের শুরু থেকে এ পর্যন্ত পুলিশ পাঁচ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে। এই সময়ে ২৪টি স্কুলে ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে; আহত হয়েছেন ৭৮ জন শিক্ষক ও কর্মকর্তা। অন্তত ১৮০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে, যাদের অনেকের শরীরেই পুলিশের রাবার বুলেটের আঘাত রয়েছে।
রাজনীতিবিজ্ঞানী রবি মোর্দে বলেন,
‘তরুণদের বোকা ভাবা বন্ধ করা উচিত। কিশোরদের সামাজিক আন্দোলনকে আমাদের দেশে কখনোই গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না। আন্দোলনের দাবিগুলো যদি কোনো দলের রাজনৈতিক ইশতেহার হতো, তবে এগুলো এত এলোমেলো হতো না। এটি অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত।’
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য শিক্ষা
ফ্রান্সের এই কিশোর বিদ্রোহ আমাদের ১৯৭১ সালের চেতনার কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন আমাদের তরুণরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে জেগে উঠেছিল স্বাধীনতার জন্য। আজ ফ্রান্সের তরুণরা জেগে উঠেছে তাদের শিক্ষাব্যবস্থার মুক্তির জন্য। প্রতিটি জাতির আত্মমর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ের পাশাপাশি নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার লড়াইও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রান্সের এই আন্দোলন প্রমাণ করে, তরুণদের কণ্ঠস্বর কখনো চাপা দেওয়া যায় না, যতই দমন-পীড়ন হোক না কেন।
আমাদের দেশেও শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, শিক্ষক সংকট ও অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। ফ্রান্সের এই অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য একটি শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। কারণ, একটি জাতির প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের সঠিক শিক্ষা ও সুযোগের সমতার ওপর।
ফ্রান্সের কিশোর আন্দোলন নিয়ে প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
ফ্রান্সের এই আন্দোলন কেন ঐতিহাসিক?
কয়েক দশকের মধ্যে ফরাসি কিশোর-কিশোরীদের এই আন্দোলন তার ব্যাপ্তি ও মেজাজের দিক থেকে দেশের অন্যতম এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধে রূপ নিয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে শুরু হওয়া এবং দ্রুত গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়া এই আন্দোলন অভূতপূর্ব।
শিক্ষার্থীদের মূল দাবিগুলো কী?
শিক্ষার্থীদের মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষক-সংকট দূর করা, বিকল্প শিক্ষক নিয়োগ, ক্লাসে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো, বিতর্কিত ‘পারকুরসাপ’ প্ল্যাটফর্ম বিলুপ্তি এবং জরাজীর্ণ স্কুল ভবন সংস্কার।
সরকার কীভাবে এই আন্দোলন মোকাবিলা করছে?
সরকার প্রথমে আন্দোলনকে ‘নগর সহিংসতা’ হিসেবে চিহ্নিত করে দমনের পথ বেছে নিয়েছে। পাঁচ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার আশ্বাস দিলেও কোনো বড় সমাধান আসেনি।
ল্য মোঁদ থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।
