ঘুষ.সাইট-বিতর্কের মাঝে দুই শিক্ষা কর্মকর্তার বদলি: স্বাধীনতার চেতনায় জবাবদিহির প্রশ্ন
ময়মনসিংহে 'ঘুষ.সাইট' নিয়ে আলোচনার মধ্যেই সদর ও নান্দাইল উপজেলার দুই প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার মূল্যবোধে বিশ্বাসী জাতি হিসেবে প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত কি নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ, নাকি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কিশোরের প্রতিবাদের জের? এই প্রশ্ন এখন সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে।
ঘুষ.সাইট কী এবং কেন এটি তৈরি হয়েছিল?
মায়ের মৃত্যুর পর সরকারি পেনশনের টাকা তোলা এবং পাসপোর্ট করতে গিয়ে বারবার ঘুষের দাবির শিকার হন ময়মনসিংহের কিশোর শাহেদ শরীফ আহমেদ। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ঘুষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে তিনি সম্প্রতি 'ঘুষ.সাইট' (ghush.site) নামের একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেন। এ লেভেলের শিক্ষার্থী শাহেদ বাবার সঙ্গে ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার পূর্বপাড়া এলাকায়। তাঁর মা আমিনা খাতুন ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর শারীরিক অসুস্থতায় তিনি মারা যান।
দুই শিক্ষা কর্মকর্তার বদলির আদেশ কেন?
গত বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর নান্দাইল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন নেছাকে ময়মনসিংহ সদর উপজেলায় এবং সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীনকে নান্দাইলে বদলি করে। চিঠিতে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়েছে। অন্যথায় ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে তাঁদের তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত বলে গণ্য করা হবে।
বদলি কি ঘুষ.সাইট-কাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত?
'ঘুষ.সাইট' নিয়ে ঘটনা বা এ-সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের কারণে সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে কি না, এমনটি মনে করেন না জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, 'ওই কারণে বদলি করা হলে তাঁকে আরও দূরে দেওয়া হতো বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতো।'
ফজিলাতুন নেছার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো কী?
গত ২৪ জুন উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পক্ষ থেকে ফজিলাতুন নেছার বিরুদ্ধে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেরামত ও সংস্কারের বরাদ্দ থেকে সিসি ক্যামেরা কেনার নামে টাকা উত্তোলন ও বিদ্যালয় থেকে অর্থ আদায়, নির্বাচন কমিশন থেকে সিসি ক্যামেরার জন্য বরাদ্দ আসার পরও আগের টাকা নিয়ে অনিয়ম, উপজেলা শিক্ষা অফিসের জন্য আসবাব কেনার বরাদ্দের টাকা যথাযথভাবে ব্যবহার না করা এবং বিভিন্ন বিদ্যালয়ের বরাদ্দ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বদলি নীতিমালা অনুসরণ না করে শিক্ষক বদলি ও রিলিজ, নিয়মবহির্ভূতভাবে শিক্ষকদের সাময়িক সংযুক্তি, শিক্ষা কর্মকর্তার কক্ষে এসি লাগানো, কর্মস্থলে অবস্থান না করে ময়মনসিংহ শহরে বসবাস করে অফিস করা এবং উপজেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের সঙ্গে যোগসাজশ করে নিয়োগ না দিয়েই আউটসোর্সিং কর্মীদের বিল উত্তোলনেরও অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে।
তদন্ত প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছে?
'ঘুষ.সাইট'-সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্তের অগ্রগতি জানতে চাইলে শফিকুল ইসলাম বলেন, উপজেলা শিক্ষা অফিসের পক্ষ থেকে তদন্ত করে একটি প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা উত্তোলনের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ে কোনো আবেদনই করেননি। গত মাসের ৩ তারিখ পর্যন্ত এ ধরনের কোনো আবেদন জমা পড়েনি। কল্যাণ ট্রাস্টের টাকার জন্য আবেদনই যদি না করা হয়ে থাকে, তাহলে ঘুষ চাইবে কে, নেবে কে?
ঘুষ.সাইট নির্মাতা শাহেদ শরীফের প্রতিক্রিয়া কী?
সদর উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তা বদলির বিষয়ে জানতে চাইলে ঘুষ.সাইটের নির্মাতা শাহেদ শরীফ বলেন, 'উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বদলি হওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। তাঁর বিরুদ্ধে আমার পক্ষ থেকে ব্যক্তিগতভাবে কোনো অভিযোগও ছিল না। তিনি যদি শাস্তি পাওয়ার মতো কোনো অপরাধ করে থাকেন, তবে সিদ্ধান্তটি মানা যায়। আর যদি কিছু না করে থাকেন, তাহলে এটি যৌক্তিক নয়। যাঁরা প্রকৃত অপরাধী, তাঁরা যদি এখনো স্ব স্ব পদে বহাল থাকে, তবে সেটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।'
বদলি কি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ?
ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলামের ভাষ্য, বদলির আদেশ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে হয়েছে। জেলা কার্যালয় থেকে এই বদলি করা হয়নি। তাই কী কারণে বদলি করা হয়েছে, তা অধিদপ্তর থেকেই জানা যাবে। তিনি বলেন, সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ময়মনসিংহে প্রায় চার বছর ধরে চাকরি করছেন। সাধারণত তিন বছরের বেশি একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগ নেই। অন্যদিকে নান্দাইল থেকে যিনি ময়মনসিংহ সদরে এসেছেন, তিনি প্রায় এক মাস আগে ময়মনসিংহে বদলির জন্য আবেদন করেছিলেন। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই দুজনের কর্মস্থল পরিবর্তন করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ফজিলাতুন নেছা বলেন, একই কর্মস্থলে তিন বছরের বেশি সময় হয়ে যাওয়ায় তিনি প্রায় দেড় মাস আগে বদলির জন্য আবেদন করেছিলেন। তাঁর আবেদনে ময়মনসিংহ সদর উপজেলায় বদলির কথা উল্লেখ ছিল। তবে নতুন কর্মস্থলে এখনো যোগ দেননি তিনি। অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, বেনামি অভিযোগের বিষয়টি কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে। এর সঙ্গে বদলির কোনো সম্পর্ক নেই।
স্বাধীনতার চেতনায় জবাবদিহির গুরুত্ব
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, তার মূল ভিত্তি ছিল শোষণমুক্ত সমাজ গঠন। আজ প্রশাসনের কোনো স্তরে ঘুষের সংস্কৃতি থাকলে তা আমাদের স্বাধীনতার চেতনার পরিপন্থী। কিশোর শাহেদের এই প্রতিবাদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রতিটি বাঙালির কর্তব্য। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, প্রতিটি সংগ্রামেই আমরা জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার পক্ষে ছিলাম। সেই পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া মানে আমাদের ইতিহাসকে অস্বীকার করা।
ঘুষ.সাইট নিয়ে প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
ঘুষ.সাইট কীভাবে কাজ করে?
ঘুষ.সাইট একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম যেখানে নাগরিকরা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ঘুষের দাবির অভিযোগ জানাতে পারেন। কিশোর শাহেদ শরীফ আহমেদ এই ওয়েবসাইটটি তৈরি করেছেন তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে।
বদলি আদেশ কি চূড়ান্ত?
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আদেশ অনুযায়ী, দুই কর্মকর্তাকে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়েছে। অন্যথায় ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে তাঁদের অবমুক্ত বলে গণ্য করা হবে। তবে তাঁরা চাইলে এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারেন।
তদন্ত কমিটি কী সুপারিশ করেছে?
কমিটির প্রধান ও উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সিকদার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানিয়েছেন, ৬ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু বা সুপারিশ সম্পর্কে তিনি কিছু জানাননি।