সাইবার সুরক্ষা আইনের খসড়া: স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি, টিআইবির কঠোর বার্তা
সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন ২০২৬-এর খসড়ায় এমন কিছু বিধান রাখা হয়েছে, যা জনগণের মৌলিক মানবাধিকার, বাক্স্বাধীনতা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এই খসড়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ, অংশীজনদের মতামত ও আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে খসড়াটি ঢেলে সাজানোর জোর দাবি জানিয়েছে।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ভাষা আন্দোলনের যে সংগ্রাম আমাদের বাক্স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত্তি রচনা করেছিল, সেই আদর্শের সঙ্গে এই খসড়া আইনের কিছু বিধান সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আজ শুক্রবার এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, 'খসড়া সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এ সাইবার অপরাধ, সাইবার সুরক্ষা ও জনগণের মতপ্রকাশের অধিকার-সম্পর্কিত তিনটি জটিল বিষয় একটি আইনে অন্তর্ভুক্ত করে তিনটির কোনোটিতেই যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বরং প্রতিটি ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ এবং উদ্দেশ্যমূলক অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা তৈরি করা হয়েছে।'
খসড়া আইনটি অনুমোদিত হলে বাংলাদেশের সাইবার স্পেস একটি অবারিত নজরদারি, জবাবদিহিহীন, নিপীড়নমূলক ভুবনে পরিণত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, 'খসড়া আইনটিতে গুজব, অপতথ্য, হেয়প্রতিপন্ন, মানহানিকর, রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকরসহ বেশ কিছু ধারণাকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যার ফলে ইচ্ছাকৃতভাবে অপব্যাখ্যার মাধ্যমে টার্গেটেড অপব্যবহার ও বিশেষ করে বাক্স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করার ঝুঁকি সৃষ্টি করা হয়েছে।'
খসড়া আইনের কোন ধারাগুলো বিতর্কিত?
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, খসড়া আইনের ধারা-৪৬(২)-এ অজামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে ধারা-২৩ এর উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে দেশের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষাসহ 'বৈদেশিক কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক' এবং 'বৈদেশিক কোনো রাষ্ট্র বা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সুবিধার্থে' ইত্যাদি যেসব বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার ঘাটতি রয়েছে। এই অস্পষ্টতা ক্ষমতাসীনদের মর্জিমাফিক প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের কথা উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, 'প্রধানমন্ত্রীসহ ২৮ সদস্যের সমন্বয়ে সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল গঠনের যে প্রস্তাব করা হয়েছে, সেখানে বেসরকারি পর্যায়ের তথ্যপ্রযুক্তি বা মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে মাত্র দুজনের অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হয়েছে। এই দুজন আবার সরকার কর্তৃক মনোনীত হবেন। ফলে সুরক্ষা কাউন্সিল সরকারের সরাসরি কর্তৃত্বাধীন অবস্থায় কোনো প্রকার জবাবদিহিহীনভাবে এ আইনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা ও যথেচ্ছ প্রয়োগের ক্ষমতা লাভ করবে।'
সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার প্রশ্নে কী বার্তা দিল টিআইবি?
স্বাধীন ও নিরপেক্ষ জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল গঠন সাপেক্ষে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা সরকারের পরিবর্তে কাউন্সিলের ওপর ন্যস্ত করার প্রস্তাব রেখে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, 'কাউন্সিল সদস্যসহ এ আইনের অধীনে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সরল বিশ্বাসে তাদের কৃত কর্মকাণ্ডের জন্য যেকোনো ধরনের ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা থেকে যেভাবে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে, তা আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এই মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।'
তিনি আরও বলেন, 'সার্বিক বিবেচনায় খসড়া আইনটি ঢেলে সাজানো ছাড়া অনুমোদিত হলে বাংলাদেশের সাইবার স্পেস একটি অবারিত নজরদারি, জবাবদিহিহীন, নিপীড়নমূলক ভুবনে পরিণত হবে, যেখানে জনগণের অভিগম্যতা সরকারের মর্জিমাফিক নিয়ন্ত্রিত হবে এবং ভিন্নমত দমনসহ মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন স্বাভাবিকতায় পরিণত হবে।'
ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে সব নাগরিকের সাইবার সুরক্ষার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা মনে করিয়ে দিয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন ও বিয়োজনের মাধ্যমে খসড়াটি ঢেলে সাজানোর জোর দাবি জানিয়েছে টিআইবি।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ভাষা আন্দোলনের যে মূল্যবোধ আমাদের জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি, সেই আলোকে এই খসড়া আইনটি পর্যালোচনা করা জরুরি। সাইবার স্পেসে নাগরিকের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে প্রকৃত গণতন্ত্রের মানদণ্ড।
খসড়া সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
খসড়া সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এ কী কী সমস্যা রয়েছে?
খসড়া আইনে সাইবার অপরাধ, সাইবার সুরক্ষা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এই তিনটি বিষয় এক আইনে আনা হয়েছে, যার ফলে প্রতিটি ক্ষেত্রে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অস্পষ্ট সংজ্ঞা ও অপব্যাখ্যার সুযোগ থাকায় এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল নিয়ে আপত্তি কী?
প্রস্তাবিত কাউন্সিলে ২৮ সদস্যের মধ্যে মাত্র দুইজন বেসরকারি বিশেষজ্ঞ থাকবেন, যাঁরাও সরকার কর্তৃক মনোনীত। ফলে কাউন্সিলটি সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং জবাবদিহিহীনভাবে ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ পাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
টিআইবি কী দাবি জানিয়েছে?
টিআইবি খসড়াটি ঢেলে সাজানোর দাবি জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের মতামত এবং আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন ও বিয়োজন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।